
কুড়িগ্রামের উলিপুরে এক রিকশা চালকের ছেলে আশিকুল ইসলাম এমবিবিএস মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জামালপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে অদম্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নন্দুনেফড়া এলাকার শফিকুল ইসলাম ও দুলালি বেগমের একমাত্র পুত্র সন্তান আশিকুল ইসলাম। তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে আশিকুল দ্বিতীয় বলে জানান পরিবার।
নম্র ও ভদ্র মিতব্যয়ী স্বভাবের অভাবী পরিবারের সন্তান এর আগেও তার মেধার পরিচয় দিয়েছেন। গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত হোকডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং উলিপুর মহারানী স্বর্নময়ী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ২০২৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। ২০২৪ সালে গাজিপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তীর্ণ হয়ে ফিশারিজ বিষয় পায়। কিন্তু তার একটাই চাওয়া পাওয়া ছিলো সে ডাক্তার হবে। ২০২৪ সালে এমবিবিএস মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও হাল ছেড়ে দেয়নি আশিকুল। ২০২৫ সালে আবার এমবিবিএস মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলে ৪৬১০ তম মেধা তালিকায় জামালপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। রিকশা চালকের ছেলে হয়েও অন্তরে বুনেছিল পাহাড়সম স্বপ্ন, আজ যেন তারই সফলতার প্রান্তে পৌঁছাতে চলেছে আশিকুলের।
আশিকুলের সাফল্যের পেছনে তার স্কুল, কলেজ এবং পরিবারের নিরন্তর সহযোগিতা ছিল। তার মতে, সঠিক পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং পরিবারের দোয়া তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা আশিকুলের ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। তরুণদের কাছে আশিকুল এখন এক অনুপ্রেরণার নাম। তার সাফল্য প্রমাণ করে যে গ্রাম থেকেও বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। সবাই আশাবাদী সে ডাক্তার হয়ে দেশের মানুষের সেবায় কাজ করবে এবং আরও অনেক সফলতার নজির স্থাপন করবে।
অভাব অনাটনের মধ্য দিয়ে তার এই ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য এলাকাবাসী গর্বিত। আশিকুলের সকল শিক্ষক, পরিবার এবং বন্ধু বান্ধব ও আত্বীয় স্বজন তার এই অর্জনকে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন। মেডিকেলের ফলাফল ঘোষণার পর ওই পরিবারজুড়ে আনন্দের অশ্রু দেখা গেলেও আবেগাপ্লুত বাবা-মা তার লেখাপড়ার খরচ চালানো নিয়ে শংকিত। আশিকুল ইসলামের বাবা পেশায় একজন রিকশা চালক এবং মা একজন গৃহিণী হলেও তারা আদর্শবান অভিভাবক। এক অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে সফলতার পথ দেখিয়েছে। ছেলের অদম্য সাফল্যে তারা আবেগাপ্লুত। ছেলেকে যে কোন মূল্যে মেডিকেলের পড়াশোনা শেষ করে ডাক্তার হয়ে সমাজের গরীব অসহায় মানুষের পাশে থেকে সেবা চালিয়ে যেতে পারে এ আশা বাবা মায়ের।
আশিকুল ইসলাম জানায়, তার স্বপ্ন সেরা ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। বিশেষ করে গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে থেকে সেবা চালিয়ে যাওয়া। আমি চাই, আমার শিক্ষায় আর সেবায় সবাই উপকৃত হোক। দেশের প্রতিটি মানুষ চিকিৎসা যেন সহজে পেতে পারে।
বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, ছেলের এমন সাফল্যে আমি আবেগাপ্লুত। এক অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে সফলতার পথ দেখিয়েছে। ১৫ বছর আগে তিস্তা নদীতে ৩বার বসতভিটে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অভাবের কারণেই লেখাপড়া করতে পারিনি। বর্তমান ১শতক জমির উপর ঘর উঠিয়ে ঢাকা শহরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। আমার মতো অর্থের অভাবে আশিকুলের লেখাপড়া যেন থেমে না যায় সেজন্য নিজে অনেক কষ্ট করছি। তাকে উচ্চশিক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যেতে দেশের সরকার, স্থানীয় সরকার ও এলাকার বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করছি।
মা দুলালি বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই ছেলেকে আমরা মানবিক হতে শিখিয়েছি। তার বড় স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা। অভাবী সংসারে আশিকুলকে একজন ডাক্তার হিসাবে আল্লাহ তায়ালা কবুল করে নেয় এজন্য দেশবাসীর নিকট দোয়া ও সহযোগিতা করার কথা বলেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, মেধাবী আশিকুল ইসলাম প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করেছে। এমবিবিএস মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির বিষয় অবগত হয়ে তাকে অভিনন্দন জানানো হয়। উপজেলায় অভাবী অসহায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে যে কোন ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।