
খুলনা ব্যুরো : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একইদিনে অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। এবারের এই নির্বাচনে খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনে ৩৫ জন প্রার্থী ভোট যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছেন।
এর মধ্যে ৫ জন হেভিওয়েট প্রার্থীকে নিয়ে আগ্রহ বেশি ভোটারদের।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় উঠে এসেছে এসব প্রার্থীর বৈচিত্র্যময় তথ্য। সেখানে দেখা গেছে অধিকাংশ হেভিওয়েট প্রার্থীদের চেয়ে তাদের স্ত্রীরা বেশি সম্পদশালী।
মিয়া গোলাম পরওয়ার:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ ( ডুমুরিয়া- ফুলতলা ও খানজাহান আলী থানার একাংশ) আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
হলফনামা ঘেঁটে দেখা গেছে, মিয়া গোলাম পরওয়ারের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। তার স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে অকৃষিজমি ও ভবন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১ কোটি টাকা। এসব সম্পদের অর্জন মূল্য ২২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তিনি নগদ ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৩৩ টাকা জমা থাকার তথ্য দিয়েছেন।
এর বেশিরভাগ অর্থ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে রয়েছে।
এমকম পাস এ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৪৮টি ফৌজদারি মামলার তথ্য আছে। এসব মামলার বেশিরভাগই ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দায়ের করা হয়েছিল। অধিকাংশ মামলায় তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন এবং বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয় ফৌজদারি মামলা নেই।
হলফনামায় পরওয়ার নিজেকে একজন ব্যবসায়ী ও সাবেক শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি ব্যবসা থেকে আয়ের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ৮০ হাজার ৬৫০ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী এবং ১ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্রের কথাও উল্লেখ করেছেন। সব মিলিয়ে তার অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। ২০২৫ কর বছরে তিনি ৫ হাজার ৬২৫ টাকা কর পরিশোধ করেছেন।
হলফনামার তথ্যানুযায়ী, পরওয়ারের স্ত্রী ১৫ ভরি স্বর্ণের মালিক, যার অর্জন মূল্য ছিল ৪৫ হাজার টাকা। তবে এসব মূল্যবান সামগ্রীর বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ২২ লাখ ৫৭ হাজার ২০ টাকা। ব্যাংকেও তার স্বল্প পরিমাণ সঞ্চয় রয়েছে।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু:
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ-সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের প্রার্থী। মঞ্জুর শিক্ষাগত যোগ্যতা এলএলবি। পেশা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন ব্যবসা। বছরে তার আয় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৭০ লাখ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তার। এর মধ্যে তার নগদ অর্থ ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩০৩ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৪৭ টাকা, ২৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের মোটরযান, ৫২ হাজার টাকার গহনা, ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা মূল্যের ইলেকট্রিক পণ্য রয়েছে তার। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৪০ লাখ টাকার।
তার স্ত্রীর এক কোটি ৫১ হাজার ৫৫৫ টাকার অস্থাবর এবং এক কোটি ৯০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ৫ হাজার টাকা আয়কর প্রদান করেছেন। এই নেতার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে।
রকিবুল ইসলাম বকুল:
খুলনা-৩ (দৌলতপুর, খালিশপুর ও দিঘলিয়ার আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল। হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এমবিএ পাশ এই নেতার নামে ১২টি মামলা থাকলেও তার ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পদ মাত্র ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে আছে ২৪ লাখ তিন হাজার ৮৪৭ টাকা। ব্যাংকে আছে নিজ নামে ১৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ টাকা ও স্ত্রীর নামে ৩০ লাখ ৭০ হাজার ১৬৮ টাকা। স্ত্রীর স্বর্ণ আছে ৪০ ভরি, সঞ্চয়পত্র ৪০ লাখ টাকার। উত্তরাধিকার সূত্রে আছে ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৩ টাকা। অকৃষি জমি স্ত্রীর নামে এক কোটি ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৬৫ টাকার, ভবন আছে নিজ নামে ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার ৬০০ টাকার। স্ত্রীর নামে এক কোটি ১০ টাকার।
আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছেন, বছরে নিজের আয় ১৮ লাখ ৮০ হাজার ১৮৭ টাকা ও সম্পদ ৭০ লাখ ৯১ হাজার ৮৪১ টাকা। তিনি কর দিয়েছেন দুই লাখ ২৭ হাজার ৫৪৭। স্ত্রীর আয় ১৯ লাখ ৫ হাজার ৯৪২ টাকা ও সম্পদ ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৩ টাকা। স্ত্রী কর দিয়েছেন ৭ লাখ ১৩ হাজার ২১১ টাকা। তবে স্ত্রীর পেশা উল্লেখ করেননি তিনি।
আজিজুল বারী হেলাল:
বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্যবিষয়ক সম্পাদক এসকে আজিজুল বারী হেলাল খুলনা-৪ (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) আসনের প্রার্থী।
হলফনামা অনুযায়ী, হেলালের নিজের নামে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। তবে অস্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৫৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। বিএসসি পাশ এই নেতা পেশায় নিজেকে ‘রাজনৈতিক কর্মী’ হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার সংখ্যা ১৫টি। অস্থাবর সম্পদের পুরোটাই ব্যাংকে জমা, এফডিআর ও নগদ টাকা। টেলিভিশন টক শো ও অনলাইন থেকে বছরে সম্মানী হিসাবে তিনি ৬ লাখ টাকা আয় করেন।
আলী আসগর লবী:
সাবেক সংসদ-সদস্য ও বিসিবির সাবেক সভাপতি খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া- ফুলতলা ও খানজাহান আলী থানার একাংশ) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলী আসগর লবী।
হলফনামার তথ্য থেকে জানা গেছে, স্নাতক পাশ লবীর চার কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার ২৫০ টাকার স্থাবর ও ৫২ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার দায় রয়েছে ১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। আলী আসগর লবীর কাছে নগদ এক কোটি ২০ লাখ টাকা রয়েছে। স্ত্রীর নামে ছয় কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৬১১ টাকার স্থাবর ও তিন কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। লবীর নামে বর্তমানে ২টি এবং আগে ৪টি মামলার বিবরণ পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের আয়কর রিটার্নে ৪৭ কোটি ৪০ লাখ ৬৫ হাজার ৭৫৭ টাকার সম্পদের বিপরীতে প্রায় তিন কোটি টাকার আয়কর জমা দেন লবী। তার স্ত্রীর ১০ কোটি টাকার বিপরীতে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার আয়কর দেওয়া হয়। সম্পদের মতো লবীর ঋণের পাল্লাও ভারী। তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা।