
দ্রুত বদলাচ্ছে পৃথিবীর জলবায়ু। ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশও। চলতি শতাব্দীর শেষে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ৪.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাড়বে তাপপ্রবাহের তীব্রতা।
তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাড়বে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া ও শিশুর খর্বকায়তার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি। শুধু তাপমাত্রাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ঋতুর আচরণেও। বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষি ও জীবিকায়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেটেরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ুর এ উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় সহযোগিতা করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন।
আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটির ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সেভ দ্য চিলড্রেন।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ।
গবেষণায় দেশের জলবায়ু সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। কারণ দেশটি সমতল নদীনির্ভর, জনবহুল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের বিস্তৃত ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, শতাব্দীর শেষে দেশের তাপমাত্রা ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে তীব্রতর তাপপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি এবং জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো না যায়, তাহলে ২০৪১ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি থেকে ২ ডিগ্রি বাড়তে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে ১.৫ ডিগ্রি থেকে ৪.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাপপ্রবাহ আরো বেড়ে যাবে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় সারা বছরই তীব্র গরম থাকতে পারে। তীব্র ও বিস্তৃত তাপপ্রবাহ মৌসুমে ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন
ভবিষ্যতে বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ শতাব্দীর শেষে বর্ষার মোট বৃষ্টিপাত গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি বাড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। অতিবৃষ্টির ফলে বাড়বে বন্যা ও ভূমিধস।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যা, প্রভাব পড়বে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে
পৃথিবী গরম হওয়ায় বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়বে। এর ফলে বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় বন্যা বাড়বে। বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূমির সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ লাখ মানুষ স্থায়ী বন্যার কারণে জায়গা হারাতে পারে। এ ছাড়া সমুদ্রের পানি বাড়লে লবণাক্ততা বাড়বে। এতে ফসল, মাছ ধরা ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্বাস্থ্য ও জীবিকায় প্রভাব
গবেষণায় বলা হয়েছে তীব্র গরমে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। শ্রমিকদের কাজ করা কঠিন হবে এবং তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। গরমের তীব্রতা এক শতাংশ বাড়লে চাইল্ড স্টান্টিং বা শিশুর খর্বকায় হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে ৫৬ শতাংশ।
এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি কেন
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন একদিনে থামানো যাবে না। তাই এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এমনকি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালেও কিছু পরিবর্তন হবে। কিন্তু গ্রিনহাউস গ্যাস ও দূষণ কমানো না গেলে ভবিষ্যতের ক্ষতি ভয়াবহ হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকি সামাল দিতে দুইভাবে কাজ করতে হবে। একটি হলো, প্রশমন বা দূষণ কমানো। অন্যটি হলো অভিযোজন, অর্থাৎ, ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি নেওয়া। এরমধ্যে রয়েছে বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র, প্রযুক্তি ব্যবহার ইত্যাদি।