বাংলাদেশ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি

  প্রতিনিধি ১ জুন ২০২৩ , ৬:১৪:১৫ প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের দর্পণ ডেস্ক :

আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখানে বিদ্যুৎ খাতে ৩৩ হাজার ৮২৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং জ্বালানি খাতে ৯৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উন্মোচনকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।

বিদায়ী অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।

বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ক্ষমতা সম্প্রসারণের ফলে দেশের শতভাগ মানুষ ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট থেকে বর্তমানে ২৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার বহুমুখী করার লক্ষ্যে কয়লা, এলএনজি, তরল জ্বালানি, দ্বৈত জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, পটুয়াখালী জেলার পায়রা, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও মাতারবাড়ি এলাকায় নির্মিত পাওয়ার হাবগুলোতে মেগা-প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল প্রকল্প (১ম ইউনিট) এবং পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে।

মাতারবাড়ি (২x৬০০ মেগাওয়াট) আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিক্যাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে মোট ১২ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ২ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তির কথা চলছে।

এছাড়া সরকার মোট ১০ হাজার ৪৪৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে।

বিদ্যুৎ সংগ্রহে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ সম্পর্কে মোস্তফা কামাল বলেন, দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সরকার আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ সংগ্রহ করছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রায় ৯ হাজার ০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে ভারত থেকে মোট ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।’

এছাড়াও, ভারতের ঝাড়খন্ডে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ১ম ইউনিট থেকে ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। নেপালের সাথে যৌথভাবে নির্মাণ করা একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এছাড়াও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য বাংলাদেশ, ভুটান ও ভারতের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে শিগগিরই।

তিনি আরো বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারব।’

বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এছাড়া ২০৪১ সালের মধ্যে সরকার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ ক্লিন এনার্জি থেকে উৎপাদন করতে চায় বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী আরো বলেন, এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে, ৬০ লাখ সোলার সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে অফ গ্রিড এলাকায় বসবাসকারী জনগণকে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

সারাদেশে মোট আটটি লার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে ডিজেল চালিত পাম্পের জায়গায় সৌরচালিত পাম্প বসানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫৭০টি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার সম্মিলিত ক্ষমতা ৪৯ দশমিক ১৬ মেগাওয়াট।

বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মোট ৮৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাশিয়ার সহায়তায় রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উৎপাদিত বিদ্যুৎ জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে গত ১৪ বছরে ৬ হাজার ৬৪৪টি সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়েছে।

এভাবে সঞ্চালন লাইন এখন ১৪ হাজার ৬৪৪ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও, বিতরণ লাইন ৩ লাখ ৬৯ হাজার থেকে ৬ রাখ ৬৯ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ সিস্টেম লস ১৪ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

মন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ট্রান্সমিশন লাইন ২৮ হাজার কিলোমিটারে সম্প্রসারিত করা।

এছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ এবং বিদ্যুতের অপব্যবহার রোধের লক্ষ্যে গত ৫ (পাঁচ) বছরে প্রায় ৫৩ লাখ প্রি-পেইড স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা
২০০৯ সালের তুলনায়, জ্বালানি তেলের স্টোরেজ ক্ষমতা ৮ লাখ ৯৪ হাজার টন থেকে ২০২১-২২ সালে ১৩ লাখ ৬০ হাজার টনে বেড়েছে।

এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে জ্বালানি তেলের মজুদ ক্ষমতা ৩০ দিনের পরিবর্তে ৬০ দিনে বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আমদানি করা জ্বালানি তেল (ডিজেল) দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় এবং সৈয়দপুরে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হবে।

ভারতের শিলিগুঁড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত একটি পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চলছে।

এই পাইপলাইনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব বলে জানান মন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকায় একটি বৃহৎ সমন্বিত তেল শোধনাগার স্টোরেজ ট্যাঙ্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ভোলা জেলার গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিদিন গ্যাসের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে।

তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের একমাত্র তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স ক্ষমতা বৃদ্ধির পর দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ৯৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট বৃদ্ধি করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪৬টি কূপ খনন করা হবে।

আশা করা হচ্ছে, সব কূপ খননের পর প্রতিদিন ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। উপকূলীয় এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানও চলছে।

যেহেতু এই কাজের জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তাই আমরা বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি।

তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে স্পট বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও কেনা হচ্ছে। এছাড়া কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে প্রতিদিন ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সূত্র : ইউএনবি