
দক্ষিণের জনপদ খুলনায় মঙ্গলবারের সকালটি শুরু হয় এক অস্বাভাবিক ভারী আবহ নিয়ে। ফজরের নামাজের পরপরই ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এক শোকাবহ খবর—বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে উদ্বেগজনক সংবাদ। মুহূর্তেই সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে নগরীর অলিগলি থেকে গ্রামগঞ্জে। খুলনার বাতাসে যেন হঠাৎ করেই নেমে আসে স্তব্ধতা।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকা শুরু করে জেলা শহর ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে বিএনপি ও সমমনা দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় গভীর আবেগ। অনেককে প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। বন্ধ হয়ে যায় দৈনন্দিন কাজকর্ম। দোকানপাটে আড্ডা থেমে যায়, চায়ের কাপে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে একটি নাম, খালেদা জিয়া।
নগরীর বিভিন্ন মসজিদ ও বাড়িঘর থেকে ভেসে আসে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের সুর। কোথাও কোথাও দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়। অনেক নেতাকর্মী কালো ব্যাজ ধারণ করেন। দলীয় কার্যালয়গুলোতে কালো পতাকা উত্তোলনের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি। রাজনৈতিক উক্তি ও অতীত সংগ্রামের স্মৃতিচারণে ভরে ওঠে টাইমলাইন।
বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, এমন খবর মানুষের মনে শুধু শোক নয়। এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও শূন্যতার অনুভূতিও তৈরি করেছে। কারণ বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেতা নন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের নাম।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, আমরা তাঁকে শুধু নেত্রী হিসেবে দেখিনি। তিনি ছিলেন আমাদের সাহস। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত যেভাবে তিনি আপস করেননি। সেটাই আমাদের শক্তি।
খুলনার এক তরুণ সমর্থক বলেন, আমাদের প্রজন্ম তাঁর সরকার দেখেনি ঠিকই, কিন্তু তাঁর কারাবরণ, অসুস্থতা আর সংগ্রামের গল্প শুনে বড় হয়েছি। সকালে খবরটা শুনে মনে হলো পরিবারের কাউকে হারিয়েছি।
এমন প্রতিক্রিয়া শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কয়রা, ফুলতলা, তেরখাদা, ডুমুরিয়া, রূপসা, দিঘলিয়া, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন উপজেলায়ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে একই আবেগ লক্ষ্য করা যায়। অনেক জায়গায় সাত দিনের কর্মসূচির ঘোষণায় কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, কালো ব্যাজ ধারণ ও শোকসভা করা।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে রাজনীতিতে আসলেও তিনি খুব দ্রুতই নিজস্ব নেতৃত্বগুণে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রশাসনে নানা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় আসে ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ে। একের পর এক মামলা, কারাবরণ, দীর্ঘ অসুস্থতা। সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন রাজনীতির এক প্রতীক। সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন নির্যাতনের শিকার এক নেত্রী, যিনি কখনো মাথা নত করেননি।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায়গুলো কেটেছে কারাগার, হাসপাতাল ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। তাঁর অনুপস্থিতিতেও দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন প্রতীকী প্রেরণা।
খুলনার এক বিএনপি নেতা বলেন, তিনি কথা বলতে না পারলেও তাঁর নীরব উপস্থিতিই আমাদের আন্দোলনের শক্তি ছিল।
দক্ষিণাঞ্চলে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি একটি বিশেষ আবেগ দীর্ঘদিনের। খুলনা, বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় তাঁর সফর, জনসভা ও আন্দোলনের স্মৃতি এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। অনেকেই বলেন, দুর্যোগপ্রবণ এই অঞ্চলের মানুষের কষ্ট তিনি বুঝতেন।
মঙ্গলবারের সকালটি তাই শুধু একটি খবরের সকাল ছিল না, ছিল স্মৃতি, আবেগ ও আশঙ্কার এক দীর্ঘ মুহূর্ত। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অপেক্ষা করেছে নিশ্চিত তথ্যের জন্য। আবার কেউ কেউ প্রার্থনায় সময় কাটিয়েছেন।
যে নামটি সকাল থেকে খুলনার বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে তিনি কেবল একজন রাজনীতিক নন। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক দীর্ঘ অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। মঙ্গলবারের সকালটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক নাম, যাঁকে ঘিরে আবেগ, শোক ও ইতিহাস কখনো আলাদা করা যায় না।