উপ-সম্পাদকীয়

মা হলেন একজন দার্শনিক

  প্রতিনিধি ১১ মে ২০২৪ , ৬:৪৩:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ

মা হলেন একজন দার্শনিক

সৃষ্টির আদিকাল থেকে যদি বলা হয় কোন শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ত্যাগ শিকার করেছেন। চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবে সবাই সেই শ্রেণি হলেন “মা”। গর্ভের এক বিন্দু রক্ত থেকে কষ্ট সহৃ করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ছায়ার মত লেগে থাকে মা। জন্মের সময় সহস্র যন্ত্রণা, জন্মের পরে ছোট্ট একটা রক্তে গড়া শিশুকে বানিয়ে ফেলেন পৃথিবীর বিখ্যাত মানব। বলতে গেলে তিনি দার্শনিক ভূমিকায় থাকেন আমাদের।

কথা বলা, আচার-আচরণ, খাওয়া দাওয়া, সব ঠিকঠাক রাখা সবই তার একার। রাত তিনটা, বয়স তিন মাস প্রস্রাব করে বিছানা ভিজিয়ে দিয়ে কান্না করে উঠে সন্তান। পাশে বাবা সারাদিন পরিশ্রম করে এসে ঘুমায়। বাচ্চা কান্না করলে রাগ দেখিয়ে বলে কান্না বন্ধ করাও। কান্না না থামলে বাবা চিৎকার দিয়ে বলে আমি কী ঘুমাব নাকি! অথচ মা কখনো রাগ করে বলেনি সন্তান কী শুধু আমার একার? তোমারও! তোমার বাচ্চা তুমিই সমালাও। বাবাকে ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে মা সন্তান কোলে নিয়ে রাত তিনটায় বেলকনিতে এসে হাঁটছেন।

আহা! সারা পৃথিবী যেখানে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সেখানে একজন মা সন্তান কে নিয়ে বেলকনিতে পড়ে আছে। সন্তান ঘুমাইলে এসে শুয়ে পড়ে। যে জায়গায় ভিজে সেখানে মা ঘুমায় সন্তানকে শুকনা জায়গায় রাখে। শুকনো জায়গায় প্রস্রাব করলে মা ভেজা জায়গায় যায়। মাঝখানে রাখে। মাঝখানে ভিজিয়ে দিলে মা চুপচুপে ভিজায় শুয়ে বুকের উপর নিয়ে আসে। সকালবেলা রুটি খাওয়ার সময় আমি খেয়েছি তোরা খেয়ে নে বলে চরম মিথ্যা বলা। পান্তা ভাত শেষ হলে এক লোকমা ভাতকে পানি বেশি দিয়ে খাওয়া। দুপুরে সব ভালো খাবার আমরা খাওয়ার পরে মা কোনো একটা সাধারণ কিছু দিয়ে চালিয়ে দেওয়া। রাতে সবার খাওয়া শেষ হলে পাতিলের নিচের কয়েকটা ভাত ঝেঁকে নিয়ে খাওয়া। কোথাও গেলে বারবার ফোন করা। রাতে তাড়াতাড়ি না আসলে টেবিলে বসে থাকা।

পৃথিবীর কোনো স্থানে বিপদে পড়লে সবার আগে মায়ের মনে আন্দাজ হওয়া।কোথাও যাওয়ার আগে সব প্রস্তুত করে দেওয়া। প্রচণ্ড জ্বর শরীর একদম শক্তি নেই। নিজের চোখে পানি না আসতেই মায়ের চোখে পানি গড়িয়ে জমিনে পড়ে। সারারাত সন্তানের পাশে বসে মাথায় জলপট্টি দেওয়া। রাতে তাহাজ্জুদে মহান অধিপতির কাছে দোয়া করা। সৃষ্টির সূচনা থেকে মায়ের মত ভূমিকা বর্তমান অবধি কেউ রাখতে পারেনি। সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বড় সৃষ্টি হলেন মা। গর্ভ থেকে শুরু করে যত যন্ত্রণা তিনি গিলে ফেলেন তা অন্য কোনো সম্পর্কের মাঝে সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীতে মা’ অজস্র জ্ঞানী-গুণী, কবি-সাহিত্যিক সমস্ত বিষয়ে মহামানবের জন্ম দিয়েছেন। যাঁদের জন্য বিশ্ব আজ এত সুন্দর। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পাশে থাকেন এই মা নামের মহিলাটি।

মরণব্যাধি রোগে যেখানে মানুষ দেখতে যায় না সেখানে মা সেবা করে। সারিয়ে তুলেন ভয়ংকর রোগ। গড়ে তুলেন আদর্শ মানবে যাতে পুরো জাতি উপকৃত হয়। মায়ের দোয়ায় তৈরি হয়েছিল বায়েজিদের মতো মানব। মায়ের হাতে গড়ে উঠেছিল মহা নবীর মত শ্রেষ্ঠ নবী। মায়ের যত্নে আলোকিত করেছে জগতকে থমাস আলভা এডিসন। মায়ের কাছে যুগের পরে যুগে তৈরি হয়েছিল ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত সন্তান। যাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। দুনিয়ার সমস্ত কিছুর আদর-ভালোবাসা একদিকে। মা নামের সম্পর্কের ভালোবাসা-তদারকি অন্যদিকে। যার ভালোবাসা-যত্নের কাছে পুরো ছায়াপথ ব্যর্থ।

এই একান্ন কোটি কিমির বসুন্ধরায় কোনো জায়গায় খারাপ পরিস্থিতিতে থাকলে আটশো কোটি মানুষ থেকে প্রথমে মায়ের বুক কেঁপে উঠে। শুরুতেই তাঁর হৃদয়ে আঘাত হবে। এই যেন সৃষ্টকারীর এক লীলাখেলা। একটা গোপন সুতোয় যেন আটকে দিয়েছেন মায়ের অন্তর দেশের সাথে। সাহারা মরুভূমির মরূদ্যানে বিনা ছায়ায় থাকা সম্ভব। কিন্তু মায়ের আঁচল ছেড়ে থাকা সম্ভব না। প্রসান্তের মাঝখানে ডিঙি নৌকায় আরোহণ করা সম্ভব যদি মায়ের আশীর্বাদ থাকে সঙ্গে। কঠিন তৃষ্ণায় পানি পান করে হৃদয়ে যে শান্তি লাগে মায়ের হাসিমুখ চেহারা তার চেয়ে সহস্রগুন শান্তির। মা মাঝে মাঝে মিথ্যা বলেও স্বস্তি অনুভব করে। যখন সকালে রুটি কম থাকে৷ তিনি বলেন আমি খেয়েছি তোমরা খাও৷ অথচ তিনি খায়নি।

মাংসের ছোটো টুকরো প্লেটে নিয়ে বড়ো টুকরো আমাদের প্লেটে তুলে দিয়েও তিনি সুখ পান৷ নিজের চিন্তা না করে আমাদের চিন্তা বেশি করেন। কঠোর পরিশ্রম করেও তিনি ক্লান্ত হোন না সন্তানসন্ততির জন্য। গভীর রাতে উঠে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের জন্য ক্রন্দন করতে থাকেন। মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভেঙে যায় কান্নার আওয়াজ শুনে। চোখ মেলে দেখি অন্ধকার পুরো বাড়ি। কান তুলে শুনতে লাগলাম শব্দ আসে কোথায় থেকে? তিন ন্যানো সেকেন্ড ধরে ফেললাম এটাতো মায়ের কণ্ঠ। যে কণ্ঠে আমার জন্য রহমত খুঁজতে ব্যস্ত মহান রব থেকে।

আমাকে যাতে শান্তিতে রাখে সেই কামনায় অধিপতির কাছে হাত পেতেছেন৷ নিরব তিমিরে আমার চোখের জল এসে গড়িয়ে পড়ে বুকে। তিনি মা যার সাথে ভূ-খণ্ডের কারো উপমা হয় না। তিনি মা যিনি ছেলেমেয়ের হাসিতে হাসেন কান্নাতে কাঁদেন। তিনি মা যিনি ছেলেমেয়ের সফলতায় চোখ ভিজান আনন্দময় অনুভূতিতে। এই সবুজ গ্রহের সমস্ত মাকে আল্লাহ ভালো রাখুক৷ যাঁরা হারিয়ে গেছেন মনিবের ডাকে তাঁদের জান্নাত দান করুক।
ওমর ফারুক
ইংরেজি বিভাগ
সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম।

আরও খবর

Sponsered content

Powered by