
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা সদরে শব্দদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ভ্যান-রিকশার লাগামহীন হর্ণ, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রচারণা; সব মিলিয়ে প্রতিদিন অতিষ্ট হয়ে উঠছে মানুষের জীবন। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, রোগীরা অসুস্থ পরিবেশে ভুগছে, আর সাধারণ পথচারীরা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
উপজেলা সদরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মোরেলগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিদিন ভয়াবহ শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে। ক্লাস চলাকালীন অবস্থায় রিকশা ও ভ্যানের হর্ণ, দোকানের বিজ্ঞাপন কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মাইকের আওয়াজ ভেসে আসে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে, এতে তারা পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। পরীক্ষার সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
একজন দশম শ্রেণির ছাত্রী জানান, “ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছেন, আর বাইরে থেকে ভ্যানের হর্ণ বা মাইকের শব্দ ভেসে আসছে। এতে মাথা ধরে যায়। পড়াশোনায় মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রচারে মাইক ব্যবহার করছে। এদিকে স্থানীয় বেশ কিছু হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রোগী টানতে মাইকে প্রচারণা চালাচ্ছে। অথচ এসব স্থানে শব্দ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে জরুরি। রোগীদের শান্ত পরিবেশে থাকার কথা থাকলেও সেখানে সারাক্ষণ উচ্চস্বরে প্রচার চলছে।
আগে রিকশা ও ভ্যান ছিল নীরব যানবাহন। কিন্তু এখন অনেক চালক মোটরসাইকেলের মতো হাই-পাওয়ার হর্ণ ব্যবহার করছেন। ইদানিং ভ্যানগুলো অনবরত প্যাঁ প্যাঁ শব্দে হর্ণ বাজাতে থাকে। কখনো কখনো বাজারের ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ তীক্ষ্ণ শব্দে পথচারীরা ভয় পেয়ে যান। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মেয়েকে প্রতিদিন স্কুলে আনতে-নিতে ভয় লাগে। রিকশা আর ভ্যানের হর্ণে রাস্তা পার হওয়া যায় না। মনে হয়, কোনো দুর্ঘটনা ঘটবেই।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের জন্য সহনীয় শব্দের মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবেল। অথচ মোরেলগঞ্জ সদরে দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা প্রায়ই ৯০ থেকে ১১০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন এমন শব্দদূষণে থাকলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মানসিক অস্থিরতা, অনিদ্রা ও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ নেই। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চালানো উচিত। দোকান, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রচারে মাইক ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা দরকার। পাশাপাশি ভ্যান ও রিকশায় হর্ণ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে।
উপজেলা সদরের মানুষ এখন শব্দদূষণের কবলে অসহায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এর ভয়াবহ প্রভাব ভোগ করছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।