Online Desk
১১ জানুয়ারী ২০২৬, ৮:০২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শ্রীপুরে খেজুর রস ও গুড় চাষ, তিন মাসের আয়ে চলে কারিগরদের বছর

শ্রীপুরে খেজুর রস ও গুড় চাষ, তিন মাসের আয়ে চলে কারিগরদের বছর

শীতের মৌসুমে পিঠা-পায়েসের অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুরের গুড়। আজ থেকে ২০ বছর আগেও শীতের আগমনে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা খেজুরে রস ও গুড় তৈরীর উৎসবে পরিণত হতো। কালের বিবর্তনে সেই উৎসবের আকার ছোট হয়ে এসেছে। কমেছে খেজুর চাষ, কমেছে রস সংগ্রহকারী গাছি ও গুড় উৎপাদনকারী চাষীর সংখ্যা। উৎসবের আকার ছোট হলেও থেমে নেই কর্মযজ্ঞ। গাছের রস ধারণ থেকে শুরু করে জমাট বাঁধার আগ পর্যন্ত কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় গুড়।

শীতের আগমনে শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া (ডাবলের পুকুর) এলাকায় রাত পেরিয়ে ভোর শুরু হওয়ার আগেই খেজুর গাছের রস নামানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২ শতাধিক খেজুর গাছ থেকে আনুমাণিক ৬’শ কেজি রস কড়াইয়ে রেখে শুরু হয় চুলায় জ্বাল দেওয়ার কাজ। ভিটিপাড়া এলাকায় এমনই এক উৎসবমুখর কর্মব্যস্ততা। ডাবলের পুকুরপাড় এখন কেবল জলাশয় নয়, বরং খাঁটি গুড় তৈরির একটি অস্থায়ী কারখানা। ভোর থেকেই শুরু হয় কড়াইয়ে রস জমিয়ে চুলায় জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরীর কাজ।

ভোরের কুয়াশা মোড়ানো প্রকৃতিতে উনুনের ধোঁয়া আর খেজুর রসের ম ম গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠে ভিটিপাড়া এলাকার ডাবলের পুকুর পাড়। খেজুরের গুড় চাষীদের কঠোর পরিশ্রম তাদের এনে দিয়েছে জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। ভোরের আলো ফোটার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষগুলো কিছু কাঁচা রস কিনে নিয়ে যান। বাকিটা সারাদিন ধরে চলে চুলার ওপর গুড় হওয়ার প্রক্রিয়া। এই তিন মাস গাছিদের দম ফেলার সময় থাকে না। হাড়কাঁপানো শীতে কঠোর পরিশ্রম হলেও এই কাজই সচল রাখে বহু মানুষের সংসার। আধুনিকতার ভিড়ে শ্রীপুরের এই দৃশ্যটি আজও প্রমাণ করে— যান্ত্রিকতা বাড়লেও প্রকৃতি আর মানুষের এই নিবিড় সম্পর্কই আমাদের লোকজ সংস্কৃতির আসল প্রাণ।

ভিটিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে ২ শতাধিক খেজুর গাছ। সেসব থেকে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করা হয়। চারজন দক্ষ শ্রমিকের একটি দল প্রতিদিন বিকেলে গাছে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেন। সূর্যের আলো ফোটার আগেই হাঁড়ি নামিয়ে ৬০০ কেজি কাঁচা রস সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত এই রসের একটি অংশ ভোরেই টাটকা হিসেবে উৎসুক ক্রেতাদের কাছে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। বাকি বড় অংশটি বড় বড় টিনের কড়াই বা উনুনে ঢেলে দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা নিবিড়ভাবে জ্বাল দেওয়ার পর জমাট বেঁধে গুড়ের উপযোগী হওয়ার আগ পর্যন্ত রস দুই থেকে তিন ঘণ্টা জাল দেয়া হয়। রস তাওয়ায় থাকার সময় একটু পরপর ফেনা জমে যায়। একজন চুলায় জ্বাল দেয়, একজন ফেনা তুলে ফেলে দেন।

এসময় বাষ্পীভূত হওয়ায় রসের পরিমাণও কমতে থাকে এবং প্রায় ৫০ কেজি সুস্বাদু ও খাঁটি গুড়তৈরি হয়। এখানে নেই কোনো কৃত্রিম উপাদানের মিশেল, নেই অতি লাভের আশায় দ্রুত কাজ শেষ করার প্রবণতা। কেবল অভিজ্ঞতা আর প্রথাগত পদ্ধতিই এখানে প্রধান চালিকাশক্তি। অগ্রহায়ন মাস থেকে শুরু করে মাঘ মাস পর্যন্ত টানা তিন মাস চলে এই গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ। কোনো প্রকার রাসায়নিক বা ভেজাল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এই গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

পুকুর পাড়ে ধোঁয়াশা কুয়াশা জমে আছে চাদরের মতো, চারপাশ এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় মোড়া। সেই স্তব্ধতা ভেঙ্গে গাছিরা গাছের গায়ে দড়ি জড়িয়ে নিপুণ ছন্দে ওপরে ওঠেন। পরম মমতায় নামিয়ে আনেন সারারাত ধরে ফোঁটায় ফোঁটায় জমে থাকা মাটির হাঁড়িগুলো। হাঁড়ির মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে শীতের হিমেল বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস। অগ্রহায়ণের শেষ থেকে মাঘের কনকনে শীত পর্যন্ত সময়টাতে ভিটিপাড়া জনপদে এভাবেই ফিরে আসে খেজুর রসের গুড় তৈরির কাজ।

পুকুরপাড়ের খোলা চত্বরে বড় বড় পাত্রে ঢালা হয় সংগৃহীত কাঁচা রস। কেউ শুকনো কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালায়, কেউ কড়াই বসায়। চুলার আঁচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রস ফুটতে শুরু করে, সাদা ফেনা উপচে পড়ে। সময়ের সাথে সাথে রসের স্বচ্ছ রং বদলে হতে থাকে গাঢ় লাল। দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য আর অভিজ্ঞ হাতের কারুকাজে তরল রস একসময় রূপ নেয় ঘন সোনালি গুড়ে। চারপাশ তখন মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা।

একই গ্রামের কারিগর (গাছি) ইউনুছ মিয়া বলেন, শীতের এই তিন মাস তাদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। কঠোর পরিশ্রমের পর যখন খাঁটি গুড় উৎপাদিত হয় এবং ভালো দামে বিক্রি হয়, তখন তাদের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা যায়। তারা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে এই ক্ষুদ্র শিল্পটিকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

আব্দুর রশীদ (৫০) রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাঝুবাঘা ইউনিয়নের চন্দ্রগাতি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, আমি প্রায় ১০ বছর যাবত খেজুর গুড় তৈরি সাথে জড়িত। আমি একটি মাধ্যমে খোঁজ পেয়ে কার্তিক মাসের প্রথম দিকে ভিটিপাড়া গ্রামে আসি। নিজের গ্রাম থেকে সাথে তিনজন কারিগর মাসুদ, শামসুল হক এবং ইউনুস মিয়াসহ আমরা চারজন আসছি। শীতের প্রথমদিকে খেজুর গাছের ডালপালা ছাঁটাই করেন গাছিরা। পরে তারা গাছের বুক চিড়তে শুরু করেন। আধা হাতের মতো জায়গায় বাকল তুলে ফেলেন তারা। এভাবে সাত দিন রাখা হয়। এ সময়ের মধ্যে ছাল তুলে ফেলা জায়গাটা শুকিয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, টাটকা কাঁচা রস ৭০ টাকা কেজি, খেজুরের ঝুলা (রসি) গুড় ৪০০ টাকা এবং পাটালি গুড় ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। তিনজন কারিগরের (গাছি) এই সিজনে এক জনের বেতন ১ লাখ ২৫ হাজার, ১ লাখ ২০ হাজার এবং অপরজনের ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তার খরচ হয় ৫ লাখ টাকার মতো। কারিগরদের বেতন দিয়ে তার ২ থেকে সোয়া ২ লাখ টাকা আয় থাকে। ওই টাকা দিয়ে তারা আগামী শীত পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলেন।

আবুল কাশেম বলেন, তাদের গুড় তৈরির পদ্ধতি খুবই ভালো। আমি মাঝে মাঝে তাদের কাছ থকে কাঁচা রস, ঝুলা (রসি) এবং পাটালি গুড় নিয়ে পরিবারসহ খাই। তাদের পাটালি গুড় খুবই সুস্বাদু। আমি তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে আত্মীয়স্বজনদেরকে ও দেই।

তারা মনে করেন, শ্রীপুরের ভিটিপাড়া গ্রামের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করেই স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনের এই ধারাটি একদিকে যেমন গ্রাম বাংলার শেকড়ের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে, অন্যদিকে গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উলিপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

উলিপুরে ভাগিনার লাঠির আঘাতে মামার মৃত্যু, ভাগিনা গ্রেপ্তার

মাহফিলে যাওয়ার পথে বাসচাপায় শ্যালক-দুলাভাইয়ের মৃত্যু

ধুনটে ইউপি সদস্য সহ ১০ জুয়াড়ি গ্রেফতার

দেশের সাফল্যের দরজা খোলার চাবিকাঠি জনগণের হাতে – অধ্যাপক আলী রীয়াজ

ধুনটে সেচ যন্ত্রের পাইপ ভাংচুর, সেচ কাজ ব্যাহত

নাগেশ্বরীতে দুস্থ ও প্রতিবন্ধী শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ

“বেকারদের কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই হবে আমার প্রথম পদক্ষেপ” — সাইদ উদ্দিন খান জাবেদ

বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ‘বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ঢাকা -সিলেট মহাসড়কে মাদক কারবারি গ্রেফতার

১০

কাজিপুরে একই মঞ্চে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা

১১

রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে- বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন

১২

মোরেলগঞ্জে প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেনকে বিদায় সংবর্ধনা

১৩

দিনাজপুর ৬টি আসনে ভোটের মাঠে লড়াই করবেন ৪০ জন প্রার্থী

১৪

সিরাজদিখানে শেখ আব্দুল্লাহকে অভিনন্দন জানিয়ে লতব্দীতে বিএনপির আনন্দ মিছিল

১৫

গৌরীপুরে ২৯৪ তম স্কাউট ওরিয়েন্টেশন কোর্স অনুষ্ঠিত

১৬

আশুলিয়ায় শ্রমিক ফেডারেশন নেতৃবৃন্দদের সাথে থানা শ্রমিক দলের মতবিনিময় সভা

১৭

জয়পুরহাটে জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটের প্রচার মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে

১৮

গৌরীপুরে শিবিরের বিক্ষোভ মিছিল

১৯

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে পটুয়াখালীতে নির্বাচনী সৌহার্দের সংলাপ অনুষ্ঠিত

২০