শনিবার ৬ জুন ২০২০

২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

১৬ এপ্রিল ২০২০ : ০৪ : ২৬

করোনায় নববর্ষের অনুষ্ঠান বন্ধ তৈরি সোলা ফুল নিয়ে হতাশ ঝিনাইদহের সোলা শ্রমিকরা

বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে সোলা পল্লীর কারিগররা সকল প্রস্তুতি শেষ করেছিলেন। ঘরে সাজিয়ে রেখেছেন সোলার তৈরি থোকা থোকা ফুল, কিন্তু বিক্রি নেই। মহাজনেরা বলেই দিয়েছেন আপাতত মাল পাঠাবেন না। এই অবস্থায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের নরদিহী গ্রামে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র এই শিল্পের প্রতিবন্ধী ও নারী শ্রমিকরা তাদের পারিশ্রমিক (বেতন) পাচ্ছেন না। অনেকে সামনের দিনগুলোতে এই শিল্পের জন্য খারাপ সময় ভেবে কাজ করতে আসা ছেড়ে দিয়েছেন, যারা আসছেন তারা নিতান্ত বিকল্প কাজ না পেয়েই আসছেন।

স্থানীয়ভাবে এই শিল্পটির বর্তমান পরিচালক তোফায়েল হোসেন জানান, দেশের এই পরিস্থিতিতে সবকিছু যেমন স্থাবির তেমনি তার শিল্পটিও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে। বৈশাখ উপলক্ষে তৈরি করা মালামাল বাড়িতেই পড়ে আছে। মহাজনেরা নতুন করে মাল নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, এমনকি বকেয়া টাকাও দিচ্ছেন না। এই অবস্থায় কি করবেন, আর কিভাবে অসহায় প্রতিবন্ধী ও নারীদের পারিশ্রমিক দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না।


 
বর্তমান পরিচালক তোফায়েল হোসেন জানান, ২০০৪ সালে তার ভগ্নিপতি প্রতিবন্ধী সিরাজুল ইসলাম এই সোলার কারখানা গড়ে তোলেন। নাম দেন রিগ্যাল হ্যান্ডিক্রাফ্টস এন্ড ড্রাই ফ্লাওয়ার। সিরাজুল ইসলামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ গ্রামে। তিনি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নরদিহী গ্রামে এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কয়েক বছর তাদের কারখানায় শতাধিক শ্রমিক ফুল তৈরির কাজ করতেন। যাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জন প্রতিবন্ধী ছিল। সিরাজুল ইসলাম প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য বাড়িতে এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। যারা বসে বসে কাজ করতে পারতেন। বর্তমানে সিরাজুল ইসলাম অসুস্থ হওয়ায় কারখানা তিনি দেখাশুনা করেন।
তোফায়েল হোসেন জানান, বর্তমানে কারখানায় ৩০ জন কাজ করেন। যারা সোলা দিয়ে ফুল তৈরি ও ফুলের মালা গাথার কাজ করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে সোলা সংগ্রহ করে সেটাকে কেটে ফুল তৈরির উপযোগী করেন। এরপর মালা তৈরি। অনেকে কারখানায় আবার অনেকে তাদের এখান থেকে সোলা নিয়ে বাড়িতে বসেই ফুল তৈরি করছেন। তিনি জানান, প্রায় ৪০ প্রকারের ফুল ও ফুলের মালা তারা এই সোলা দিয়ে তৈরি করে থাকেন। গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতেও এই সোলা ফুলের কদর বেশি। তিনি জানান, ফুল তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে সোলা কেটে কাগজ তৈরি করে সেটাকে রোল বানানো হয়। তারপর বেলী, জিনিয়া, গোলাপ, ছোট গোলাপ, গোলাপকুড়ি, গন্ধরাজ, রজনীকুড়ি, জিরোফুলসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল তৈরি করেন। এগুলো সারা বছর চাহিদা থাকলেও পহেলা বৈশাখে চাহিদা দ্বিগুন বেড়ে যায়। যে কারণে তারা এই সময় অতিরিক্ত পরিশ্রম করে ফুল তৈরি করেন। ঘরে মজুদ করেন নানা ধরনের ফুল। যা দিয়ে সাজবে বাংলার তরুণ-তরুণীরা, বরণ করবে বাংলা নববর্ষকে। নববর্ষের মুহুর্তে বেলী, জুই, জিনিয়া, পদ্ম, গন্ধরাজ ফুলের চাহিদার যেন শেষ থাকে না।


 
তোফায়েল হোসেন জানান, এবারও বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে তারা অতিরিক্ত ফুল তৈরি করেছেন। ইতিপূর্বে বছরের অন্য সময়ে মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। কিন্তু দেশে চায়না ফুলের আগমন ঘটায় তা কমে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু নববর্ষের সময় বিক্রি হয় লক্ষাধিক টাকার ফুল। এবারও তারা লক্ষাধিক টাকার ফুল মজুদ করেছেন। কিন্তু কোনো বিক্রি নেই। তিনি জানান, তারা এগুলো ঢাকায় পাঠান। সেখানে রং করার পর বিক্রি হয়। অনেক সময় দেশের বাইরেও যায়। কিন্তু এখন ঢাকার মহাজনরা মাল পাঠাতে নিষেধ করেছেন। সরকারিভাবে পহেলা বৈশাখ এর সকল অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে তাদের এই মাল আর বিক্রি হবে না। যারা তার কারখানায় কাজ করেন তাদের পারিশ্রমিক দিতে পারছেন না। ইতিমধ্যে ৩৫ হাজার টাকা বকেয়া হয়ে গেছে। মাস গেলেই তাদের ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়। টাকা দিতে পারছেন না, তাই অনেকে কাজ ছেড়েও দিচ্ছেন।

কারখানায় কাজ করছিলেন তুলি বেগম। তিনি জানান, সংসারে কাজের পাশাপাশি এই সোলার ফুল তৈরির কাজ করেন। এখান থেকে মাস শেষে যে ৩ থেকে ৪ হাজার আয় হয় তা স্বামীর অসচ্ছল সংসার সহায়ক হয়। এখন মালামাল বিক্রি না হলে মালিক কিভাবে টাকা দেবেন। আর তাদের এই কাজ বন্ধ হলে আবারও সংসার অভাব দেখা দেবে। চায়না খাতুন জানান, তাদের এটি ক্ষুদ্র শিল্প হলেও এর সঙ্গে বেশ কয়েকটি পরিবার জড়িয়ে আছে। যারা বাড়িতে অন্য কাজের পাশাপাশি এই কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। এই কাজটি বন্ধ হলে অন্য কাজেও যেতে পারবেন না। ফলে সরকারের এই ক্ষুদ্র শিল্পটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।