
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হচ্ছে।
শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পোলট্রি শিল্প। গ্রামের খামারিরা লোডশেডিং ও জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে খামারের মুরগি। এতে ডিম ও মাংসের উৎপাদনও কমেছে। ঘরের চালে ঝরনা, বাড়তি ফ্যানের ব্যবস্থা করেও মুরগি সুস্থ রাখতে পারছেন না। ফলে চরম লোকসানে পড়ছেন খামারিরা।
বাসা-বাড়ীর মালিকেরা বলেন, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর অধীন এলাকায় দিনরাতে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ডিজেল এবং পেট্রোল সংকটের কারণে জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে গরমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ-সব শ্রেণি পেশার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময়ে অপ্রত্যাশিত ঘনঘন লোডশেডিং শিক্ষার্থীদেরকে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।
উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার গ্রামের গৃহিণী অজুফা বেগম অভিযোগ করেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎবিহীন পরিবেশে পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনের বেলায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। রাতেও একই চিত্র, ফলে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
শ্রীপুরের কাওরাইদ গ্রামের কৃষক সেকান্দর আলী বলেন, বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন বলছেন চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গাজীপুরে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকাগুলোতে একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এতে বোরো মৌসুমে কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে।
শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের গোলাঘাট গ্রামের খামারি আবু তালেব বলেন, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তিনি। নিজ গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তার খামার বিস্তৃত। কয়েকটিতে মাংস এবং বেশিরভাগ শেডে ডিমের জন্য মুরগি পালন করেন তিনি। দিনরাতে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। এদিকে জ্বালানির দাম বাড়ায় ও সংকটে মাঝেমধ্যে জেনারেটর চালিয়েও মুরগি বাঁচানো যাচ্ছে না। এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তালেবের সোহাদিয়া গ্রামের পোলট্রি খামারে দেখা যায়, বিদ্যুৎ নেই। দুটি জেনারেটর চলছে। তালেব জানান, গত বুধবার ঝড়ের পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসেনি। এ ছাড়া নিয়মিত লোডশেডিং তো আছেই।
তিনি আরো বলেন, পাম্পে গেলে তো সিরিয়াল ধরে তেল পাই না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রতি লিটারে ৩০-৫০ টাকা বেশি দিয়ে তেল কিনতে হয়। জেনারেটর চালাবো, সেজন্য সময় মতো ডিজেল পাচ্ছি না।
খামারি আবু তালেব বলেন, ডিম দেওয়া মুরগিতে নির্দিষ্ট সময়ে আলো না দিলে ডিমের উৎপাদন কমে যায়। কৃত্রিম উপায়ে বাতাস না দিলে মুরগি রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হয়, স্ট্রোক করে মারা যায়। সময়মতো পানি সরবরাহ না করতে পারলে মুরগি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। প্রচণ্ড উত্তাপে মুরগির টোটাল লেভেল (উৎপাদন ও শারীরিক সক্ষমতা) কমে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের কারণে মুরগির পাতলা পায়খানা হয়। অতিরিক্ত ভিটামিন প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এভাবে খরচ বাড়ে, কিন্তু উৎপাদন কমে। তখন দামও বেড়ে যায়। আগে এক হাজার মুরগি জন্য বিদ্যুৎ খরচ হতো তিন থেকে চার হাজার টাকা। সেখানে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার টাকায় উঠে গেছে। উৎপাদন খরচ থেকে বর্তমানে প্রতিটি ডিমে প্রায় দুই টাকা লোকসান গুনছি। পোলট্রি শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অথবা ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি দিতে হবে। তা না হলে সংকট বাড়তেই থাকবে। এতে বাজারের ডিম ও মাংসের সরবরাহ কমে যাবে। সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান এই উৎসের দাম নাগালের বাইরে চলে যাবে।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন, এ সেক্টরকে বাঁচাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করা না গেলে অন্তত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে খামারিদের।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুরের মাওনা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শান্তনু রায় বলেন, মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াট এবং শ্রীপুরে ২১২ মেগাওয়াট। আমরা ৩টা গ্রীড থেকে পুরো উপজেলাতে পাওয়ার পাই। শ্রীপুর গ্রীডে পাচ্ছি ২৫ শতাংশের মতো লোডশেডিং। শ্রীপুর গ্রীডে ডিমান্ড আছে ১০৫ মেগাওয়াটের মত। ক্যালকুলেশনে ৮০ মতো আসে পিক আওয়ারে। অফ পিক আওয়ারে লোডশেডিং আরো কম থাকে।
শ্রীপুর উপজেলা সদর অংশটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছে রাজাবাড়ী এবং রাজেন্দ্রপুর গ্রীড থেকে। এ অংশে ডিমান্ড আছে ৫০ মেগাওয়াটের মত। এখানে লোডশেডিং পাচ্ছি ৪৫ থেকে ৫০% এর মত। চাহিদার তুলনায় অন এভারেজে ২৫ থেকে ৩০% এর মত কম পাচ্ছি।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ বলেন, এ জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে তারা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি। এই সমিতি শ্রীপুর ছাড়াও গাজীপুর শহর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।