
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের উলিপুরে চরাঞ্চল সহ বিভিন্ন এলাকায় আলুর ফলন ভালো হলেও দামে ধস নামায় খরচের টাকা উঠাতে হিমশিম খাচ্ছেন আলু চাষিরা। বাজারে আলুর চাহিদা না থাকায় জমিতে ফেলে রেখেছেন মরা গাছ সহ আলুর ক্ষেত। এতে করে আকাশের বৈরী আবহাওয়া একটু একটু বৃষ্টি হওয়ায় আলুর ক্ষতির সম্ভাবনায় কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কৃষকের।
বিগত কয়েক মৌসুমে ভালো ফলন ও সন্তোষজনক দামে খুশি ছিলেন আলুচাষিরা। সেই ধারাবাহিকতায় বেশি লাভের আশায় এবার ধারদেনা ও ঋণ করে ব্যাপক আকারে আলু চাষ করেছেন। তবে মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি শ’ টাকা দাম পেলেও বর্তমানে আলুর দাম নেমে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে তিস্তার চরাঞ্চলে ৮০ ভাগ আলুর চাষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানাযায়, উপজেলায় মধ্যে ৩টি ইউনিয়ন বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই ও দলদলিয়া তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত। এ ৩টি ইউনিয়নে গোড়াইপিয়ার, আমনিয়াশা, হোকডাঙ্গা, টিটমা, নাগড়াকুড়া, দড়িকিশোরপুর, মধ্যগোড়াই, কদমতলা, অজুর্ন, বিরহিম, সন্তোষঅভিরাম, সাদুয়াদামারহাট, কর্পূরা, খারিজালাটশালাসহ ছোট বড় অসংখ্য চর ভেসে উঠেছে। এসব চরে আলু চাষের জন্য উপযোগী হয়ে উঠায় একরকময় একর জমিতে আলুর চাষ করেছেন এসব এলাকার কৃষকেরা। উপজেলার আলু চাষের লক্ষ্য মাত্রার ৮০ ভাগ আলু এসব চরাঞ্চলে চাষাবাদ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, এবারে আলু চাষের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১শত হেক্টর। অর্জিত হয়েছে ১ হাজার ৩শত ৫০ হেক্টর। লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে ৩ শত ৫০ হেক্টর বেশি অর্জিত হয়েছে। এর মধ্যে চরাঞ্চলে ৮০ ভাগ আলুর চাষ হয়েছে। এছাড়া ফলনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ২ শত ৫ মেট্রিক টন।
সরেজমিন তিস্তার বিভিন্ন চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, কিছু কিছু কৃষক আগাম আলু উঠিয়ে বাজারে বিক্রি করলেও বেশিরভাগ কৃষক আলু না উঠিয়ে মরা গাছ সহ জমিতে রেখে দিয়েছে। আলুর চাহিদা না থাকায় জমি থেকে আলু উঠাচ্ছেন না। তারা জানান, একদিকে দাম কম অপরদিকে কেউ আলু ক্রয় করতে আসছেন না। আলু উঠিয়ে রাখার জায়গা নেই। বিপাকে পড়েছেন এসকল চাষিরা। লাভ তো দূরের কথা আসল টাকা উঠাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তারপরেও চাষিরা আলু তুলছেন ঠিকই কিন্তু বিক্রির সময় তাদের দীর্ঘশ্বাস ভারী হচ্ছে। কৃষকদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে একর প্রতি জমিতে আলু চাষে সার, বীজ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় লক্ষ টাকা। অথচ বর্তমানে যে বাজারদর তাতে প্রতি একর আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। অর্থাৎ একর প্রতি লোকসান দাঁড়াচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
উপজেলার বজরা ইউনিয়নের সন্তোষ অভিরাম চরের আলু চাষি আব্দুল হাই জানান, প্রতিবছর আলুর ফলন ও দাম ভালো থাকে বিধায় এবারে ধার দেনা করে ৬০ শতক জমিতে আলুর চাষ করেছি। আলু অনেক ভাল হয়েছে। বাজারে দাম কম থাকায় চাহিদা অনেক কমে গেছে। আলু উঠানোর উপযোগী হলেও জমিতেই রেখে দিতে হয়েছে। কোন পাইকার পাচ্ছেননা বা কেউ আলু ক্রয় করতেও আসছেন না। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। গরিব মানুষ হওয়ায় আলু উঠিয়ে রাখার জায়গা পাচ্ছেন না তিনি।
গুনাইগাছ ইউনিয়নের টিটমার চরের আলু চাষি এরশাদুল হক, সলেমন, জয়নাল ও নুরুল হুদা সহ আরও অনেকে বলেন, গত মৌসুমে আলুতে লাভ হওয়ায় এ বছর আবাদ বেড়েছে। কিন্তু সার, কীটনাশক ও বীজের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। লাভের আশায় ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন তারা। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এসব এলাকার কৃষকেরা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ মোশারফ হোসেন জানান, উপজেলায় এ বছর আলু চাষের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ১ হাজার ১শত হেক্টর। লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে ৩শত ৫০ হেক্টর আলু বেশি চাষাবাদ হয়েছে। তার মধ্যে ৮০ ভাগ আলু চাষাবাদ হয়েছে চরাঞ্চলে। বর্তমানে আলু তোলার কাজ শুরু হয়েছে এবং ঝড়-বৃষ্টি শুরুর আগেই আলু উত্তোলনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।