
গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি প্রত্যখ্যান করেছেন ইউরোপের নেতারা। বুধবার হোয়াইট হাউসে বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রতিনিধিরা। সেখানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সন্তুষ্ট হতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় ইউরোপে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিবিসি জানায়, ট্রাম্প ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।’ বুধবার সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে আমরা ‘গোল্ডেন ডোম’ তৈরি করছি।
এদিকে ট্রাম্পের গোল্ডেন ডোম গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গোল্ডেন ডোম একটি বহু স্তরযুক্ত প্রতিরক্ষা ঢাল, যা যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিতে সক্ষম। ট্রাম্প এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য গত বছর ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো টড হ্যারিসন মনে বলেন, গ্রিনল্যান্ড কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স এবং স্পেস নজরদারি নেটওয়ার্কের অংশ। আর গোল্ডেন ডোমের অধীনে এই ভূমিকা অব্যাহত রাখা হবে।
হোয়াইট হাউসে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ইউরোপের পক্ষ থেকে ছিলেন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোটজফেল্ড।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে মূল বিষয়টিতেই ঐকমত্য। আবারও নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরোপের নেতারা কোনোভাবেই গ্রিনল্যান্ডকে বিক্রি করতে বা দখল করতে দিতে রাজি হননি। তবে বৈঠকে একটি উচ্চ স্তরের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে আগামী সপ্তাহগুলোতে উত্তর গোলার্ধের নিরাপত্তা ও গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান করা যায়।
এই বৈঠকের পরই ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও সুইডেন গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ন্যাটোর উপস্থিতি জোরাদার করা হয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে দেশটির ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি আসে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে।
গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি জোরদার
বিবিসি জানায়, ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মৌলিক মতবিরোধ রয়েই গেছে। হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকটি খোলামেলা ও গঠনমূলক ছিল। তবে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য কোনো কূটনৈতিক সমাধান বৈঠকে আসেনি।
বৈঠকের আগে গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার ঘোষণা দেয় ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড। এর মধ্যে জাতীয় অবকাঠামো রক্ষা, যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং নৌ অভিযান পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ডেনমার্কের আমন্ত্রণে তারা গ্রিনল্যান্ডে একটি যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চলবে এই মহড়া। এই অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ ও সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতেই ‘অপারেশন আর্কটিক এন্ডুরেন্স’ নামে এই মহড়া হচ্ছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, ফ্রান্সও গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের আয়োজিত যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। ফরাসি সামরিক বাহিনীর প্রথম দল ইতোমধ্যেই মহড়ায় অংশ নিয়েছে। পরে তাতে আরও সেনা যুক্ত হবে।
সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন বলেছেন, সুইডেনের সশস্ত্র বাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বুধবার গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছে গেছে। বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাসমুসেন বলেছেন, ‘আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। গত কয়েক বছরে আমরা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছি। অতিরিক্ত ১৬টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনা হবে। এছাড়া আমরা আর্কটিক ন্যাটো রাষ্ট্রগুলোকে বৃহত্তর ন্যাটোয় সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছি।’
রাশিয়া ও চীনের স্বার্থ মোকাবিলায় জোর
এনবিসি জানায়, ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাসমুসেন বলেছেন, গ্রিনল্যান দখলের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে স্পষ্ট সীমা রয়েছে। এই সীমা তারা অতিক্রম করতে পারে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে গ্রিনল্যান্ডে আরও সামরিক ঘাঁটি বসাতে পারবে। সে ব্যাপারে আলোচনার দ্বারও খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি সত্য বিদ্যমান। তা হলো, রাশিয়া ও চীনের স্বার্থ মোকাবিলায় গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত।
মার্কিন দখল রোধ করা হবে: ফ্রেডেরিকসেন
গার্ডিয়ান জানায়, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ওয়াশিংটনে বুধবারের বৈঠকের পর বলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এটি একটি মৌলিক মতবিরোধ। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ডেনিশ সরকার ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবে পরিণত হওয়া রোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বৃহত্তর ইউরোপীয় এবং ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার বিষয়ে ন্যাটোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। ডেনমার্ক নতুন আর্কটিকের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। সূত্র: বিবিসি, গার্ডিয়ান, পলিটিকো।