
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: আশির দশকে গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ছক্কার খালটি খনন করা হয়। এটি পৌরসভার দক্ষিণ ভাংনাহাটী (ছাপিলাপাড়া) এলাকার বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে। কৃষি কাজ, মাছ ধরা ছাড়াও নানা কাজে ব্যবহৃত হতো এ খালের পানি। বর্তমানে দখল এবং দূষণের কবলে পড়ে ছক্কার খালটি বিলীনের পথে।
স্থানীয় বিভিন্ন মহলের দাবী অচিরেই খালটি দখলমুক্ত, দুষণমুক্ত করে পুন: খননের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী করা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে প্রায় বিলীন হওয়া খালটি খননের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হবে।
এলাকাবাসীর চাহিদার কথা বিবেচনায় এনে তৎকালীন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর খাল খনন কর্মসুচীর আওতায় ছক্কার খালটি খনন করেন। তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে খাল থেকে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খনন কর্মসুচীর উদ্বোধন করেন। শ্রমিকদের সাথে তিনিয মাটি কাটায় অংশ নেন। খালটি এরপর থেকে ফসলের খেতে পানি সেচ, দেশীয় প্রজাতির মাছ আহরন, কিশোর-তরুনদের অবাধ সাঁতরানো আর নিত্য প্রয়োজনীয় পানি ব্যবহারের অন্যতম উৎস হয়ে উঠে। তাঁদের দাবি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে মাটি কেটে খনন করা এ খালটি পুনঃখননের মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে তারই ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কিন্তু সময়ের বিবর্তন, খাল দখল, বিভিন্ন কল-কারখানার দুষিত বর্র্জ্যে খালের পানি দূষিত হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও খালটি তার মূল গতিপথ হারিয়েছে। এসব কারণে খালের পানিতে এখন আর কোনো জলজ প্রাণীর দেখা মেলে না। আশপাশের বাসিন্দা, পথচারী কালো পানির ঝাঁঝালো গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
ছাপিলাপাড়ার বাসিন্দা মো: বাচ্চু মিয়া (৬০) বলেন, জিয়ার আমলে আমরা ছক্কার খাল খুদছি (খনন) করছি। বর্তমানে খালটি হ্যামস গার্মেন্টস, ভিক্টোরিয়া ইন্টিমেটস এবং ঢাকা গার্মেন্টসের ক্যামিকেলযুক্ত দূষিত পানি খালে পড়ে পানি কালো রং ধারণ করেছে। খালের পানি ক্ষেতে দিলে ধান নষ্ট হয়ে যায়। শরীরে লাগলে ফুসকা পড়ে।
ছাপিলাপাড়ার আরেক বাসিন্দা আল-আমীন বলেন, আমরা ছোট সময় দেখেছি খালের পানি পরিষ্কার ছিল। খালের পানি দিয়ে বাব-চাচারা ক্ষেতের ধান চাষ করেছে। হ্যামস গার্মেন্টস খালটির বেশিরভাগ অংশ দখল করে ফেলেছে এবং তাদের কারখানার বর্জ্য খালে ফেলায় পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। দূষিত হওয়ার কারণে মাছ তো দূরের কথা জলজ প্রাণী সাপ এবং ব্যাঙ পর্যন্ত এখন খালে নেই, এতই বিষাক্ত হয়ে গেছে এ খালের পানি। বাব-চাচাদের কাছে শুনেছি জিয়াউর রহমান নিজে এ খাল খনন করেছে। আমিসহ এলাকাবাসী খালের আগের পরিবেশ ফিরে যেতে চাই।
নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান (পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন) খোরশেদ আলম বলেন, ছক্কার খালটিতে আগে সুস্বাদু পানি ছিল, সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে যে অবস্থা খালে কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকে না। আশির দশকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খালটি খনন করে গিয়েছিলেন। তখনকার সময় এ খালের যে গভীরতা এবং জলস্রুত এটা খুব দৃষ্টি নন্দন ছিল। তখনকার সময়ই পর্যটকরা এসে খালটি দেখে যেতো। বৈকালিক সময় এই খালের পাশে মানুষ ব্যায় করতেন। এ খালের পাশে কতগুলো কারখানা আছে প্রত্যেকই দখল এবং দূষণকারী।
ছক্কার খাল খনন কমিটির (সাত সদস্য বিশিষ্ট) সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য শ্রীপুর পৌর বিএনপির আহবায়ক হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল ধরে এ খালটি খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। বিভিন্ন কারখানা খাল দখল করে ফেলেছে। শিল্প-কারখানার দূষিত পানি ও বর্জ্য খালে পড়ে পানি দূষিত হয়ে গেছে। আশপাশের ভাতরুমের পানির লাইন খালে দিয়ে রেখেছে। বর্তমানে খালের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এক শ্রেণীর ভূমিদস্যু এই খালের জমির জাল কাগজ তৈরি করে বিভিন্ন শিল্প কারখানার মালিকদের কাছে বিক্রি করার পলে শিল্পপতিরা কারখানা নির্মাণ করে খাল দখল করেছে। এ খালটি শ্রীপুরবাসীর আবেগ ও আনন্দের জায়গা ছিল। আমরা শ্রীপুরবাসী আশা করছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখা এবং রক্ষা করার জন্য ছক্কার খাল থেকেই বাংলাদেশে খাল খনন শুরু করবেন।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ব্যারিস্টার সজীব আহমদ বলেন, দূষণ এবং দখল দুটিতেই জর্জরিত ছক্কার খাল। প্রথম কাজ হবে খালটিকে উদ্ধার করা, পরবর্তীতে দূষণ মুক্ত করা। দখল উদ্ধারের জন্য আমরা যেসব খাল অবৈধ দখল আছে সেগুলো চিহ্নিত করতেছি এবং চিহ্নিত করার পর উচ্ছেদ করা হবে। তারপরে প্রশ্ন হলো কিভাবে দূষনমুক্ত করা যেতে পারে। সেজন্য আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য দপ্তরের সহযোগীতা প্রয়োজন পড়বে এবং সমন্বয় করব। ইতোপূর্বেই সিদ্বান্ত হয়েছিল এ খালটিকে উদ্ধার করা। আগামী তিন মাসের মধ্যে ভালো একটা রেজাল্ট দেখতে পারব।
স্থানীয় সংসদ সদস্য (গাজীপুর-৩) অধ্যাপক ডা: এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজে কোদাল দিয়ে মাটিকে ছক্কার খালটির খনন কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। বিভিন্ন শিল্প কারখানার দূষিত পানি ও বর্জ্যরে কারণে খালটি সম্পূর্ণরূপে দূষনে পরিণত হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। আশা করছি দ্রুতই খালটির খনন কার্যক্রম শুরু করতে পারব। খালটি তার অতীত ঐতিহ্য ফিরে পেলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে, পরিবেশের উন্নতি হবে।