
পারকিনসন্স রোগ:
জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এপ্রিল মাসের ১১ তারিখকে পারকিনসন্স ডে হিসেবে উদযাপন করা হয়ে থাকে।ডব্লিউ এইচ ও এর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে বাংলাদেশে প্রতি এক লক্ষ মানুষের মাঝে চারজন এই রোগে আক্রান্ত।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে যাদের বয়স বেশি তাদের এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ে। পুরুষদের আক্রান্তের হার মেয়েদের তুলনায় অধিক।
আজ আলোচনা করব পারকিনসন্স রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে।
রোগের কারণ:
পারকিনসন্স রোগটি স্নায়ুর ক্ষয় জনিত রোগ, যেখানে দেখা যায় ব্রেইনের নিউরনের একটি রাসায়নিক সংকেত যেমন ডোপামিন এর পরিমাণ হ্রাস পায়।
এই ডোপামিন কমে যাওয়ার কারণে স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজগুলো অনিয়মিতভাবে সম্পন্ন হয় ও দেহের বিভিন্ন মাংসপেশীর মধ্যে সমন্বয় হীনতা দেখা দেয়, যা ধীর গতিতে বাড়তে থাকে, ফলশ্রুতিতে রোগী তার স্বাভাবিক জীবনের কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারেন না।
ঝুঁকি সমূহ:
বয়স : যাদের বয়স ৬০ এর অধিক তাদের এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি।
লিঙ্গ : পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে মেয়েদের চেয়ে এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
বংশগত : যাদের পূর্বপুরুষেরা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের এ রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি।
কেমিক্যালস : কিছু কেমিক্যাল যেমন কীটনাশক ও ঔষধ এর কারণে এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
মাথায় আঘাত: যারা মাথায় বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হন তাদের এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি।
গাট ব্রেইন এক্সিস (Gut Brain Axis): নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অস্বাভাবিক আচরণের জন্য পারকিনসন রোগ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
উপসর্গ :
• বিশ্রামের সময় মাথায় কিংবা হাতে মৃদু কম্পন অনুভব করা।
• পেশির অনমনীয়তা।
• ধীরগতিতে চলাফেরা।
• হাঁটার সময় ভারসাম্য রক্ষায় ও লেখনিতে অপারদর্শীতা।
• বিষাদগ্রস্ত।
• ভাবলেশহীণ অভিব্যক্তি এবং চোখের পাতায় কম কম্পন।
• বিভ্রান্তি এবং স্মৃতীশক্তির বিলোপ।
• দুর্বলতা, নিদ্রাহীনতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি:
যদি কোন ব্যক্তির স্বাভাবিক কর্ম সম্পাদনের সময় উপরের লক্ষণ গুলো প্রকাশ পায় তাহলে তাকে অবশ্যই একজন স্নায়ু বিশেষজ্ঞ এর কাছে নিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসক তার লক্ষণ গুলো বিশ্লেষণ করে ও তার দৈহিক কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগটি সনাক্ত করে থাকেন।
চিকিৎসা পদ্ধতি:
এই রোগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সারা জীবন কিছু ঔষধ সেবন করতে হয়। যেহেতু রোগীকে সারা জীবন ঔষধ সেবন করতে হবে এবং ঔষধের কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেজন্য রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।
এই রোগের স্থায়ী কোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা এখনো জানা নেই, তবে দ্রুত এই রোগের ঔষধ সেবন এর মাধ্যমে রোগী তার স্বাভাবিক জীবন উপভোগ করতে পারবেন।
ঔষধ বিহীন পারকিনসন্স রোগ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিসমূহ:
১। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে।
২।প্রতিদিন সুষম খাবার ও খাবারের তালিকায় শাকসবজি ও ফলমূল রাখতে হবে।
৩।সামাজিক বিভিন্ন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করতে হবে ও সংবাদপত্র অথবা বই পড়তে হবে।
৪।মানসিক অবসাদগ্রস্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পরিবার ও বন্ধু বান্ধবের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
৫।স্মৃতিশক্তির সমস্যা শুরু হলে প্রতিদিনের কার্যকলাপের একটি রুটিন তৈরি করতে হবে, যেন যথাসময়ে সব কার্যসম্পাদন করা যায়।
৬।নিজের ঘুম ও শারীরিক বিশ্রামের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।
পারকিনসন রোগের নতুন কিছু আবিষ্কৃত চিকিৎসা পদ্ধতি :
১।জাপান পারকিনসন রোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী স্টেম সেল থেরাপির অনুমোদন দিয়েছে। এই যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতিটি আগামীতে রোগীদের উপকারী আসবে আশা করা হচ্ছে।
২।অ্যাপোমরফিন ইনফিউশন পাম্প যা ত্বকের নীচে ক্রমাগত ওষুধ সরবরাহ করে। এর ফলে রোগী তার স্বাভাবিক কিছু কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
৩। ডিপ ব্রেন স্টিম্যুলেশন নামক একটি পদ্ধতি রয়েছে যেখানে একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড মস্তিস্কের ভিতরে স্থাপন করা হয়। আর রোগীর বুকে একটি পেসমেকার স্থাপন করা হয়।
পেসমেকারটির সাহায্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় বৈদ্যুতিক স্পন্দন মস্তিস্কে পাঠানো হয়, ফলে রোগীর শরীরের কাঁপুনি এবং জড়তা দূর করতে সক্ষম হয়।
তবে এই পদ্ধতিটি কঠিন এবং ব্যয়বহুল। কিন্তু এই পদ্ধতি এখন আমাদের দেশেও সফলতার সাথে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।