
বাঘ, কুমির, হরিণ, পাখী, পতঙ্গ ও মাছের আবাসস্থল জল-জঙ্গলের সুন্দরবন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনে ভ্রমণে দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে সপ্তাহখানেক আগেই। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে রওয়ানা করবো সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে।
ওই দিনই পূর্ব সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া ইকো পর্যটন কেন্দ্রের ফুট ট্রেইলে বিশাল আকৃতির একটি বাঘের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। তার কয়েকদিন আগে ১ অক্টোবর করমজলখালে একজন জেলেকে টেনে নিয়ে যায় কুমির। তিনমাসের নিষেধাজ্ঞার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটক, বনজীবী ও মৎস্যজীবীরা সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারছেন। নতুন মওসুমকে কেন্দ্র করে বাঘ ও কুমিরের আক্রমণ ও নির্ভরশীলদের কঠিন জীবন-সংগ্রাম নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলো বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এসব ঘটনা আমাদের সুন্দরবনের ভয়ানক সৌন্দর্য উপভোগের তাড়নার পারদ বাড়িয়ে তোলে। মিলবে বাঘের দেখা, শুনবো পাখীর কলরব, ভাসবো জলে, সুস্বাধু মাছের ঝোলে হবে উদোরপূর্তি- এমন আকাঙ্খায় ১৩ অক্টোবর রাতে দেড়টার দিকে খুলনার জেলখানা ঘাটে পৌছায় আমরা ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের ৫৫ জন সদস্য সাংবাদিক। বাস থেকে তড়িঘড়ি করে নেমেই ছোট নৌকার চড়ে আমরা পৌছে যায় তিনদিনের ভ্রমণসঙ্গী ‘আরাল সি’ জাহাজে। ভৈরবনদ থেকে রুপসা নদী পার হয়ে জাহাজ ভাসতে শুরু করে সুন্দরবনের ভেতরের পশুর নদীর জলে। বলে রাখা ভালো তিনদিনে আমাদের থাকা, খাওয়া, খেলাধুলা, আড্ডাগান সবই হয়েছে ওই জাহাজে।
প্রথম সকালে নাস্তার আগে আমরা হাজির হই জেলেপল্লী জয়মনির ঠোঠা এলাকায়। চিলির মত চিকন চরে টিনের চালের ঘর, দোকান, মৎস্য ঘের, ছোট খামার সবই আছে। স্থানীয়দের মুখে বাঘ, কুমির ও বনদস্যুদের আক্রমণেন কাহিনী শুনেই দ্রæই জাহাজে ফিরে আসি।
চা-নাস্তার পর্ব শেষ করতে করতে পৌছে যায় আন্ধারমানিক ইকো পর্যটনকেন্দ্রে। শেলা, গুষনবাড়িয়া খাল ও পশুরনদীর মহনায় আন্ধারমানিক। শুরুতেই গুল্মজাতীয় গাছে ঝোড়ের দিকে একটি সুন্দর ফুল দেখিয়ে বনরক্ষী ফারুক সর্দার সতর্ক করলেন গাছের পাতা, ফল ও ফুল না ছিড়তে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পতঙ্গ থেকে সাবধান করে দিলেন। তাকে সামনে রেখে ট্রেইল ধরে আমরা চললাম বনের গহীনে। কেওড়া, গেওয়া, পশুর, বাইন, কাকড়া ও সুন্দরী গাছের গহীন অরণ্য। জোয়ারে পানিতে ভেসে যায় বন। প্রায় ৩ কিলোমিটার ঘুরে বন্যপ্রাণী চোখে পড়েনি। এখানে অনেক পাখী ও হরিণ আছে। আছে বাঘের আনাগোনা। কিন্তু এত মানুষ দেখে ধারেকাছে ভেড়েনি কোন প্রাণীই। দুপুরে জাহাজে ফিরে এসে ¯œান-আহার সেরে বিকালে বেরিয়ে পড়ি ছোট খাল বা ক্যানেল ট্রাকিংয়ে। জাহাজ থেকে নেমে ছোট নৌকায় বসে শোনা যাবে পাখীর ডাক ও দেখা মিলবে হরিণ। ক্যানেলের দুই ধারে ঝুলে আছে গোলপাতা গাছের লম্বাপাতা। বড় বড় কেওড়া গাছের ডাল ঝুঁকে আছে খালের দিকে। বাঘ মামারা শিকার আহারের পর মাঝে মধ্যে ক্য্যানেলের উপর ঝুলে থাকা গাছে বসেই বিশ্রাম নেন। এমন একটি ক্যানেলে বিশ্রামরত বাঘ দেখে ভয়ানক শান্তি অনুভব করেন আমাদের সঙ্গে থাকা সিনিয়র সাংবাদিক কিসমত খন্দকার। বাঘ, কুমির, হরিণ, পাখীর শুধু নিজে চোখে দেখা নয় তা ছবি ধারনের উদ্দেশ্যে তিনি বহুবার সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। শুধু একবারই বাঘ দেখেছেন সেটিও ৫৫তম ভ্রমণে। ঝুলে থাকা কেওড়া ফল ছিড়ে খেলাম কয়েকজন। পথিমধ্যে দুয়েকটা হরিণের দৌড় আর গুইসাপ দেখলাম গাছে শুয়ে থাকতে। দূর থেকে কানে ভেসে আসছে পাখীর কিচিরমিচির শব্দ।
দ্বিতীয় দিনের ভ্রমণ শুরু হয় জামতলাখালের ট্রেইল ধরে হেটে ওয়াচ টাওয়ার হয়ে জামতলা সী-বিচ। বঙ্গোপসাগর থেকে উৎপত্তি হওয়া ঝড়, ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস প্রথমে এখানে আঘাত আনে। এখানকার গাছগুলো অনেক ঘন খানিকটা বেড়ার মত। জামতলা সী-বিচের গাছগুলো বুক চিতিয়ে রক্ষা করে পুরো বাংলাদেশকে। দেশরক্ষার বীরত্বের প্রমাণ দেয় ঝড়ের আঘাতে ভাঙ্গাাচারা ডালপালা এবং উপড়ে থাকা গাছগুলো।
এরপর দুপুরের একটু আগে আমরা যায় কচিখালী অভয়ারণ্যে। কচিখালী খাল থেকে টাইগার পয়েন্ট পর্যন্ত আছে ফুট ট্রেইল। টাইগার পয়েন্ট ওয়াচ টাওয়ারের ওঠে দৃষ্টিনন্দন সমতল সন ঘাসের মাঠ । আছে মাঝারি আকৃতির গাছও। এখানে হরিণের ঘাস খেতে আসে আর হরিণ শিকারে আসে বাঘ মামা। আরেকটু দূরে ‘টাইগার ডাইনিং’। শিকার ধরার পর বাঘ যেখানে গিয়ে আহার করে। স্থানীয় ভাষায় ‘বাঘের ডেরা’ বলা হয়। বিপদসংকুল ওই এলাকায় যাওয়ার রাস্তা নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সেখানে যাবো। কিন্তু বাধ সাধলেন কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক। ৪/৫ জন নারী সাংবাদিক নিয়ে রাস্তাবিহীন ঘন জঙ্গল, কাদামাটি ও শ্বাসমুলের ওই পথে যাওয়া উচিত হবেনা।
কিন্তু ইকোনমিক রিপোটার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা বললেন মেয়েদের আপত্তি নেই। ১১ জন ওখান থেকে ফিরে গেলেও ৪জন নারীসহ আমরা ৩০জন বাঘের ডেরায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সবার সামনে বন্দুক হাতে বনরক্ষী ফারুক সর্দার। সন ঘাসের মাঠ পেরিয়ে কচিখালী সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের সাইনবোর্ড। এরপর ঘন জঙ্গল শুরু। এখানে মানুষ চলাচলের কোন রাস্তা নেই। পিঁপড়ার মত লম্বা লাইন ধরে আমরা হাটুপানিতে সন্তর্পণে সামনে চলতে শুরু করলাম। কাঁদা ও শ্বাসমুল পেরিয়ে হাঁটতে অনেক বেগ পোহাতে হচ্ছিল। শ্বাসমূলের আঘাতে দুয়েকজনের পা কেটে গেছে। গহীন অরণ্যের মধ্যে ঢুকে গেছি আমরা। হাত দিয়ে গাছের ডাল ও পাতা সরিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। নারীদের যাওয়ার জন্য কয়েকজন ডাল টেনে ধরেছেন। উপরে সূর্যও দেখা যায়না। সবার মুখ বন্ধ। অজানা আতঙ্ক। এই বুঝি বাঘ এলো। বাঘের খাবার টেবিলে আমরা এতগুলো খাবার! ভাবতেই ভয়ে গায়ের শিহরণ জেগে উঠল! প্রায় সবার মুখই ভয়ে চুপসে গেছে। ভয় আছে সাপ ও জোকেরও।
তবে ভয়ঙ্করের মধ্যে যে অসীম আনন্দ আছে সেটি মনেহয় জীবনে প্রথম অনুভব করলাম। ঝোঁপ পেরিয়ে ঘন বনে ঢুকতেই বন্দুক লোড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন বনরক্ষী ফারুক সর্দার। বাঘের গন্ধ নাকে আসছে। একটু আগে বাঘ হেঁটে গেছে তার পায়ের ছাপ আমাদের সামনে। পিনপতন নিরাবতা। ফিসফিসিয়ে ফারুক সর্দার বললেন, যাই ঘটুক আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। আপনারা আতঙ্কিত হবেনা। ভয়ে কেউ দৌঁড় দেবেন না। সবাই একসঙ্গে নিরব থাকেন। কারো মুখে কোন কথা নেই। সন্তপর্ণে হেঁটে কাঁদা ও ঘন বন পেরিয়ে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালাম সবাই। মনে হল বিপদ কেটে গেছে। সেই বাঘের ডেরায় দাঁড়িয়ে চুপিসারে একটি গ্রæপ ছবিও উঠালাম। কিছুপক্ষন পর পৌঁছে গেলাম কচিখালী খালের কিনারে। এখানে পর্যটক বা স্থানীয়রা আসেন না। তাই খালে নৌকা ভেড়ানোর ঘাট তৈরি করা নেই। সেখানে কাঁদামাখা পা নিয়ে অপেক্ষমান নৌকায় চড়ে বসলাম। সবার মুখে যেন জয়ের হাসি। কিছুক্ষণ আগের ভীতিসন্তস্ত মুখগুলো আনন্দে উদ্বেলিত। ৩০ মিনিটের এই যাত্রা ছিল সত্যিই অনেক ভয়ঙ্কর, রোমাঞ্চকর এবং অতুলনীয় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। বাঘের ডেরার বুনো পথের যাত্রায় আমাদের সাহস যুগিয়েছিলেন সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের এম আব্দুল্লাহ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীনসহ আরও অনেকে ।
বুকভরা সাহসের গল্প পুঁজি করার গল্প করতে করতে জাহাজে দুপুরের খাবার শেষ করে গেলাম কটকা অভয়ারণ্যে। কেওড়াবনের মধ্য দিয়ে নির্মিত ফুট ট্রেইল ধরে চলে গেলাম কটকা সমুদ্র সৈকতে। পথিমধ্যে বন্য শুকুরের দেখা মেলে। কটকা সমুদ্র সৈকতের তীরে হরিণ মানুষের খুব কাছাকাছি এসে গাছের পাতা খায়। এখনে বিশাল এলাকা জুড়ে বড় বড় গাছগুলো শুকিয়ে গেছে। এরকারণ সমুদ্রের বালুতে গাছে শ্বাসমূলগুলো ঢেকে যায়। বালুতে নতুন করে শ্বাসমূল গজায় না। এজন্য গাছগুলো মারা গেছে। কটকার মিঠাপানির পুকুর ঘুরে আবার ঘাটে ফিরে আসি। দুহাত ভরে কেওড়া ফল কুড়িয়ে এনে নৌকায় বিতরণ করি। প্রায় তেতুল স্বাধের কেওড়া ফলে যেন প্রাকৃতিকভাবেই লবণ মেশানো আছে। সন্ধ্যার নামার আগে পৌছায় ডিমের চরে। ডিমের চরে পাশে জাহাজ নোঙর করে রাত্রি যাপন করলাম। রাতে বসল সঙ্গীতের আসর। মূল গায়ক ইটিভির তৌহিদুর রহমান। আমরা দুয়াড়ি ধরি। এসএ টিভির সালাউদ্দিন বাবলু, যুগান্তরের মনির হোসেন ও আজকালের খবরের জাকির হোসেনের কৌতুক শুনে হাসিতে জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। ইআরএফ সেক্রেটারি আবুল কাসেম, ডেইলি স্টারের আহসান হাবীব রাসেল, শেয়ারবিজের শেখ শাফায়াত হোসেন চমৎকার ভাব সঙ্গীত শোনালেন। রাতে গানের ফাকে ডিমের চরে লাইটের আলোয় দেখলাম শত শত হরিণের বিচরণ। লাইটের আলোয় হরিণগুলো মাথা উচিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই কৌশলে নাকি শিকারীরা অবৈধভাবে হরিণ শিকার করে সুন্দরবনে। সুন্দরবনে হরিণ ও মাছ শিকারের বিভৎস কাহিনী শুনলাম আমাদের ভ্রমণ রাহবার ‘টাইগার গণি’। প্রকৃতনাম আব্দুল গণি গাজী। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বাসিন্দা গণি গাজী ২০০৭ সাল থেকে বাঘ ও কুমিরের আক্রান্ত আহত ও মৃত সর্বমোট ১২৬ জন উদ্ধার করেছেন। এরমধ্যে ২০-২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। সুন্দরবনে বাঘ ও কুমিরের আক্রমণ থেকে উদ্ধার করে স্থানীয়দের কাছে টাইগার গণি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
পরদিন ১৫ অক্টোবর ভোরে আমাদের জাহাজ ভেড়ে করমজলে। করমজলে ট্রেইল ধরে হরিণ, কুমির ও বাননের লাফালাফি দেখে আমাদের সুন্দরবন দর্শন পর্ব শেষ হয়। বনের মধ্যদিয়ে সুতার মত বয়ে চলা নদী ও খালে ভেসে প্রকৃতির সানিধ্যে আমরা পার করলাম তিনদিন। কোথাও সুন্দরীবন, কোথাও কেওড়াবন, কোথাও গেওয়া, কোথাও আবার গোলপাতা, কিংবা বাইন, কাকড়া, পশুর গাছের অরণ্য। লোনা পানি আবার কোথাও মিঠাপানির প্রবাহ সুন্দরবন জুড়ে। হরিণ, বানর, কুমির, শুকুর, লাল কাকড়া, চিল আর সাদাবক দৃষ্টি সীমায় এলেও মেলেনি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা। তবে বাঘের ডেরায় দু:সাহিক পদযাত্রা এবারের ভ্রমণের অনিন্দ্য সুন্দর ও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। বাঘের সামনে পড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনাী শোনাবো অন্যকোন স্বার্থক ভ্রমণ শেষে।
কলামিস্ট ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিকেশন বিভাগ, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি.