
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের শ্রীপুরে সিজারের পর রুমা আক্তার (২৫) নামে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে। প্রসূতি মৃত্যুর অভিযোগে হাসপাতালে ব্যাপক ভাঙচুর করেছেন রোগীর স্বজনেরা। এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মাওনা চৌরাস্তা লাইফ কেয়ার হসপিটালে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত প্রসূতি রুমা আক্তার শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব এলাকার মানিক মিয়ার স্ত্রী। তাদের ঘরে ১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। রুমা গোসিংগা ইউনিয়নের হেরা পটকা গ্রামের আব্দুর রশিদের মেয়ে।
দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে নিহত প্রসূতির স্বজনেরা এবং স্থানীয় লোকজন মাওনা-কালিয়াকৈর অঞ্চালক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। আধা ঘন্টা ধরে চলমান বিক্ষোভে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে এ সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
প্রসূতির স্বামী মানিক মিয়া বলেন, তাঁর স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে শনিবার (৭ মার্চ) দিবাগত রাত ২টার দিকে মাওনা চৌরাস্তা লাইফ কেয়ার হসপিটালে ভর্তি করা হয়। রবিবার (৮ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে আশুলিয়া নারী ও শিশু কেন্দ্রের গাইনী বিশেষজ্ঞ এবং এ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: রাজশ্রী ভৈৗমিক এবং অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক রেজোয়ান রুমা আক্তারকে অপাারেশন কক্ষে নিয়ে যায়। পরে দুপুর ১২ টার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর থেকেই প্রসূতি রুমাকে অপারেশন থিয়েটারে পর্যবেক্ষণে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ সময় পরও রুমার সাথে তার স্বজনদের দেখা করতে দিচ্ছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে তাদের সন্দেহ হয়। এক পর্যায়ে রোগীর স্বজনেরা জোর করেই অপারেশন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে রুমা আক্তারকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলতে থাকে।
রুমা আক্তারের বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, সকাল ১০ টার দিকে সিজারের জন্য অপারেশন কক্ষে নিয়ে যায়। পরে ১২ টার দিকে ছেলে বাচ্চাকে বের করে দিলেও বিকেল ৪টা বেজে গেলে রোগীকে বের করছে না। সোমাবর (৯ মার্চ) সেহরি খাওয়ার পর হঠাৎ রোগীর পেট ফুলে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর স্বজনদের না জানিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য উত্তরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পথেই প্রসূতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে সকাল ৭টার নিহতের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে লাইফ কেয়ার হসপিটালে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। তারা চার তলা ভবনের হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসহ প্রতিটি তলার প্রত্যেক কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করে। স্বজনেরা অভিযোগ করেন প্রসূতি রুমাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত অবস্থায় এ হাসপাতাল থেকে বরে করে নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পর কর্তৃব্যরত চিকিৎসক রুমাকে মৃত ঘোষণা করেন।
লাইফ কেয়ার হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আজাহারুল ইসলাম পারভেজ বলেন, প্রসূতির স্বজনেরা হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে হামলা করে ভাংচুর করে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এসময় তারা ক্যাশে থাকা নগদ ২০ লাখ টাকা লুটে নেয়।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শফিকুল ইসলাম রোগীর স্বজন এবং স্থানীয়দের অভিযোগের বরাত দিয়ে বলেন, লাইফ কেয়ার হসপিটালে প্রসূতির সিজার হওয়ার পরে ফলোআপ করার জন্য ২৪ ঘন্টা যে চিকিৎিসক থাকার কথা ছিল কেউ ছিল না। আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখেছি বাচ্চাটির অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন। তখন স্বজনদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আগে নবজাতকের দ্রুত চিকিৎসা করানো হোক এবং এ ঘটনায় আইনী প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। তাদেরকে কোনো ভাবেই বুঝানো যাচ্ছে না নবজাতককে বাঁচানো জন্য। তারা আমাদের কথা শুনে নাই। নবজাতকের চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। নবজাতক মায়ের দুধ না পাওয়ার কারণে আস্তে আস্তে তার অবস্থা খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নবজাতকটি ডিহাইড্রেশনে চলে গেছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে অনুরোধ করব যেন বাচ্চাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য কোথাও রেফার্ড করে।
শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনা (ভূমি) সাইদুল ইসলাম, স্বজনদের অভিযোগ হাসপাতালে সঠিক ট্রিটমেন্ট না থাকার কারণে প্রসূতি মারা গেছে। সিজার করতে গিয়ে বাচ্চার মাথার বেশকিছু অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই ভালো একটা পরিবেশে তাকে চিকিৎসা দেওয়া দরকার। হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। পূর্বের ইতিহাস দেখে জানতে পেরেছি এ হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটেছে।
এ হাসপাতালের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসক সংকট রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আইনী প্রক্রিয়ায় হাসপাতালটি সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে।