
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামের উলিপুরে বুড়ি তিস্তা নদীর উপর নিজের জমানো টাকায় কাঠের সেতু নির্মাণ করে ওই এলাকার প্রায় অর্ধলক্ষ স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়েছেন আব্দুল করিম (৪৫) নামের এক যুবক। তার এই উদ্যোগ এলাকাবাসীর যাতায়াতের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এমন মহৎ কাজের জন্য এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। সেখানে থাকা রেল সেতু দিয়ে পারাপার হওয়া অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রায় সময় দূর্ঘটনা ঘটায় আব্দুল করিম নিজের জমানো প্রায় ৪ লক্ষ টাকা ব্যায়ে ১২০ ফিট কাঠের সেতু নির্মাণ করে দেন। সেতুটির নামকরণ করা হয় আব্দুল করিম সেতু। গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আব্দুল করিম তার নিজের মাকে দিয়ে সেতুটি আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করে সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, আব্দুল করিম উলিপুর পৌরসভার জোনাইডাঙ্গা এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ফয়জার আলীর ছেলে। ওই এলাকায় উলিপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন দক্ষিণে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী রেলসেতু দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জোনাইডাঙা, মন্ডলপাড়া, সরদারপাড়া, কাঠাখালি, তবকপুর, ভদ্রপাড়া, রেলস্টেশন, বলদিপাড়া, মুন্সিপাড়া ও খাওনার দরগাহ সহ ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও পথচারীরা চলাচল করতেন। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে তারা পারাপার হতেন। দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান থাকায় উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করলেও সরকারি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি কোন কর্মকর্তাদের। প্রায় দিনের দুর্ঘটনা আব্দুল করিমের হৃদয়ে ব্যকুল হয়ে উঠত। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন পরিশ্রম করে অর্থ আয় করে ব্রীজ করে দিবেন। দীর্ঘ ২৫ বছরের জমানো টাকা দিয়ে প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করে কাঠের সেতু নির্মাণ করে দেন। এতে করে তার এ মহৎ কাজের জন্য এলাকাজুড়ে প্রসংশায় ভাসছেন তিনি।
সরদারপাড়া এলাকার শিক্ষার্থী রোকেয়া আক্তার বলেন, উলিপুর কলেজিয়েট স্কুল থেকে এবারে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। রেল সেতুর উপর দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে অনেক ভয় পেতাম। আব্দুল করিম ভাই তার খরচে এত সুন্দর একটা ব্রীজ করে দিবেন আমরা ভাবতেও পারিনি। উনি আমাদের অনেক বড় কাজ করেছেন।
গুনাইগাছ ইউনিয়নের নাগরাকুড়া কৃষ্ণমঙ্গল এলাকা থেকে আসা পথচারী এসমোতারা (৪০) বলেন, সরদারপাড়া এলাকায় আমার আত্নিয়ের বাসা। যোগাযোগ ব্যাবস্থা না থাকায় তাদের বাসায় আসিনি। নতুন ব্রীজ তৈরি হওয়ার কথা শুনে আজ আত্নীয়ের বাসায় এসেছি। ব্রীজের উপর দিয়ে যেতে অনেক ভালই লাগল।
প্রসংশনীয় কাজ করা আব্দুল করিম বলেন, রেলের ওই লোহার ব্রীজটা দিয়ে যাতায়াত করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। প্রায়ই সময় দুর্ঘটনা ঘটতো। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় যাওয়া আসা ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর ছিল। মানুষের কষ্ট দেখে আমি ২৫ বছর যাবৎ কখন ভ্যান চালিয়ে, দারোয়ানি চাকুরী করে এবং কুলির কাজ করে যা আয় হত তার কিছু অংশ জমিয়ে রাখতাম।সেই জমানো দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে প্রথম কাজ শুরু করি। টাকা অসংকুলান হওয়ায় নিজের শখের বাইক, ছাগল সহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে এবং ঋণ করে প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে এই সেতু বানিয়েছি। বিনিময়ে কিছু চাই না,শুধু দোয়া চাই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদি হাসান বলেন, আব্দুল করিম তার নিজের জমানো টাকা ও মটর সাইকেল বিক্রি করে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ করে মানুষের চলাফেরার একটা ব্যবস্থা দিয়েছে নিঃসন্দেহে এটি প্রসংশনীয়।