
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: রাজধানীর কলা বাগান থানার ইপ-পরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হাসান সরকার শুভ নিখোঁজের ঘটনায় তার গ্রামের বাড়ী গাজীপুরের শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের বাপ্তা গ্রামের আত্নীয়স্বজন, বন্ধু, সহপাঠি এবং গ্রামের বয়োবৃদ্ধসহ গ্রামাবাসী শোকাহত।
শুভ নিখোঁজের খবরে প্রতিদিন তাদের বাড়ীতে গ্রামের নারী-পুরুষ এসে তার বাবাকে সান্তনা দিচ্ছেন। গ্রামের স্কুল থেকে প্রাইমারী পাশ করার পর লেখাপড়ার জন্য বেশিরভাগ সময় সে ময়মনসিংহ এবং ঢাকাতেই রয়েছেন। তারা বলছেন শুভ অত্যন্ত নম্র এবং ভদ্র একজন ছেলে। গ্রামে আসলে সে কখনো কারো সাথে দুর্ব্যবহার করে নাই।
সবসময় লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। বই ছাড়া সে কিছু বুঝতো না। কোনো প্রয়োজনে বাজারে গেলেও কাজ শেষ করে দ্রুত বাড়ীতে এসে পড়তো। সহজ-সরল ছেলের নিখোঁজের খবরে গ্রামের মানুষ শোকাহত। তারা প্রশাসন এবং সরকারের কাছে শুভকে দ্রুত খোঁজে বের করার আহবান জানান। শনিবার (২ মে) বিকেল ৫টার দিকে তার গ্রামের বাড়ী গাজীপুরের শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের বাপ্তা গ্রামের বাড়ীতে গিলে তারা সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন।
রাকিবুল হাসান সরকার (৩২) গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের বৈরাগবাড়ী (বাপ্তা) গ্রামের ব্যবসায়ী মাইজ উদ্দিন সরকারের ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রাকিবুল হাসান সরকার শুভ। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট ভাই সাদমান আল সাকিব ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে দর্শন বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। ছোট বোন মারিয়া আক্তার বাড়ীতে থেকে পড়াশুনা করে। চলতি বছরের ২ জানুয়ারী একই ইউনিয়নের নান্দিয়া সাঙ্গুন গ্রামের সাহাব উদ্দিনের মেয়ে সামিয়ার সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।
সেমাবার (২৭ এপ্রিল) রাত ১১ টার পর আমার মোবাইলে একটি ফোন আসে। আমি রিসিভ করে জিজ্ঞাস করছি কে বলছেন? উনি বললো আমি কলা বাগান থানা থেকে বলছি। আপনি কি রাকিবের আব্বা? জি¦, আমি রাকিবের আব্বা। রাকিব কি বাসায় গেছে? না স্যার। কোনো আত্নীয়-স্বজনের বাসায় গেছে? না আমার বাড়ী রেখে সে আত্নীয়-স্বজনের বাড়ীতে যাবে না। বাসায় কে কে আছে? আমি আছি এবং আমার একটা মেয়ে (রাকিবের স্ত্রী) আছে। পরে বলে ঠিক আছে। তার তো ডিউটি ছিল সন্ধ্যা ৭টা থেকে, সে ডিউটিতে আসে নাই। এজন্য আমরা কল দিলাম বাসায় গেলো কি’না। কলাবাগান থানায় জয়েন করার পরে সে ছুটিও কাটায় নাই, বাড়ীতেও আসে নাই। তারপর বললো মেয়েটাকে (রাকিবের স্ত্রী) দেন। মেয়েকে দিলে তার সাথে কথা বলে এবং পারিবারিক খোঁজ-খবর নিয়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করেছে, এটুকুই।
রাজধানীর কলাবাগান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিখোঁজ রাকিবুল হাসান সরকারের বাবা মাইজুদ্দিন সরকার এ কথাগুলো বলেন। শনিবার (২ মে) বিকেল ৫টার দিকে তার গ্রামের বাড়ী শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের বাপ্তা গ্রামের বাড়ীতেতে গিলে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কলাবাগান থানার সূত্র মতে উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হাসান সরকার মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকালে থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নির্ধারিত ডিউটিতে যোগ না দিয়ে কলাবাগান থানাধীন কাঁঠালবাগান এলাকার একটি অস্থায়ী ব্যারাক থেকে সিভিল পোশাকে বের হয়ে যান রাকিবুল হাসান। এরপর থেকে তার কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, এসআই রাকিবুল হাসান মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে রাত্রিকালীন ডিউটির কথা বলে কলাবাগান থানা ভবনের ব্যারাক থেকে সাদাপোশাকে বের হন। পরে চা খেয়ে আবার ব্যারাকে ঢোকেন। নাইট ডিউটি আছে বলে রাত পৌনে ৮টার দিকে আবার সাদা পোশাকে ব্যারাক থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তাকে গরহাজির (অনুপস্থিত) হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি এও বলেছেন এসআইয়ের সন্ধান পেতে কলাবাগান থানা থেকে দেশের সব থানায় পাঠানো হয়েছে বেতার বার্তা। কিন্তু রাকিবের গ্রামের বাড়ী গাজীপুরের শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমদ জানান, কলাবাগান থানার এসআই নিখোঁজ সংক্রান্ত কোনো ম্যাসেজ বা বার্তা তিনি পাননি।
তবে উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হাসান সরকারের বাবা মাইজুদ্দিন সরকার বলেন, সেমাবার (২৭ এপ্রিল) রাত ১১ টার পর কলা বাগান থানা থেকে ফোন করে জানায় তার তো ডিউটি ছিল সন্ধ্যা ৭টা থেকে, কিন্তু সে ডিউটিতে আসে নাই। পুলিশ বলছে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকালে থেকে রাকিবুল হাসান সরকার নিখোঁজ রয়েছেন। তাহলে পুলিশ তার বাবাকে আগের দিন রাতে ফোন দিয়ে কেনো জানালো রাকিব ডিউটিতে আসে নাই। কলাবাগান থানা থেকে জানানোর পর তার ছোট ভাই সাদমান আল সাকিব পরদনি মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) কলা বাগান থানায় গিয়ে তার ভাইয়ের নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডারেরি (জিডি) করে আসে। এরপরদিন বুধবার (২৯ এপ্রিল) তার ভাইয়ের খোঁজ খবর নিতে সে তার বড় বোনকে নিয়ে আবার কলা বাগান থানায় যান।
রাকিবুল হাসান সরকারের বাবা মাইজ উদ্দিন সরকার বলেন, সেমাবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ১০ টার দিকে বৌমা রাকিবের সাথে কথা বলেছে। ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করেছে এবং বলছে আব্বু কেমন আছে? ভালো আছে। খাওয়া-দাওয়া করছে? হ্যাঁ। আব্বুরে বইলো আমার জন্য দোয়া করতে। ১০-১২দিন আগে আমার সাথে মোবাইলে কথা হয়েছে। তখর সে আমার শরীরের খোাঁজ-খবর নিয়েছে। এই টুকুই। বাড়ীতে এবং বন্ধুরা তাকে শুভ নামেই বেশি চিনে। সে কোথায় যাইতে পারে আপনার কোনো ধারনা আছে কি? এ প্রশ্নে বলেন আমাদের এরকম কোনো ধারনা নাই। আমার শুভর সাথে কারো শত্রু নাই। তার পরিচয়পত্র এবং সার্টিফিকেটে তার নাম রাকিবুল হাসান সরকার। আশেপাশে দুই-চার গ্রামে কেউ আমার ছেলে শুভ’র মন্দ বা খারাপ বলতে পারবে না। শুভ বললেই সবাই পরিচিত। শুভ গ্রামের বাপ্তা মল্লিকবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ফাইভ পাশ করেছে। পরে ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন (এ+) পেয়ে এসএসসি পাশ করে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে মাস্টার্সে থিসিস করছিলো। তারপর তার ৫টি চাকরি হয়েছে। ২০২২ সালের মার্চে রবিবার দিন এশার নামজ পড়ে সে আমার আগে মসজিদ থেকে বের হয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমি বের হয়ে দেখি তার সাথে আরো ২/১জন বন্ধু আছে। শুভ বললো আব্বু আমার চাকরি হয়ে গেছে ইনকাম টেক্সে। পরে আমি আলহামদুলিল্লাহ বলে শুকরিয়া আদায় করি এবং তাকে বলি দুমি দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আসো। সে (শুভ) শুক্রবার দিন ভাইবা দিয়ে আসছে, রবিবার তাকে ফোন করে জানাইছে অফিস থেকে। পরদিনই যোগদান করার জন্য বলছে এবং তাকে স্পেশালভাবে যোগদান করাইছে। পরে সে আমার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ইনকামটেক্সের চাকরিতে জয়েন (যোগদান) করেছে। কিছুদান চাকরি করার পর আমাকে বলতেছে আব্বু আমি ইনকামটেক্সের চাকরি থেকে রিজাইন দিয়ে আরেকটা ডিপার্টমেন্টে যাব। কেন যাইবা আব্বু? ইনকাম টেক্স তো ভালো আরামের চাকরি। যেখানে আছো সেখানে কি ভালো লাগে না তোমার? তখন সে বললো এখানে ১০-১১ মাস বসে থাকতে হয়। দুই মাস হলো তাদের কার্যক্রম। তবে সে ইনকামটেক্সের চাকরি ছেড়ে কিসে যাইব এ বিষয়ে আমার সাথে তার কথা হয় নাই। তার আরেকটা চাকরি যখন ফাইনাল হয়ে গেছে তখন সে রিজাইন লেটার তার স্যারের টেবিলে রাইখা আইসা পড়ছে। ইনকামটেক্স অফিসের তার স্যার আবার তাকে ফোন করে নিয়েছে। পরে সে অফিসে গিয়ে বলে স্যার আমি রিজাইন লেটার দিয়ে গেছি। তার স্যার বলে আমরা এটা এক্সেপ্ট করব না। তুমি আমার সামনে টেবিলে লেখো। আমার শুভ শান্ত এবং ভদ্র ছেলে। সে বই ছাড়া কিছু বুঝে না। কোনো রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না। বিকেল অল্প সময়ের জন্য বাহিরে বরে হলেও মাগরিবের আযানের সাথে সাথে বাড়ীতে এসে পরতো। সে সবসময় বইয়ের ওপর নির্ভর ছিল। ২০১০ সালে ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুভ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন (এ+) পেয়ে এসএসসি পাশ করে। পরে ঢাকার ধানমন্ডি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগ থেকে (এ+) পেয়ে বিএসসি করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে এসআই পদে চাকরি হয়। রমজান মাসের দিকে কলাবাগান থানায় যোগদান করে। ওই থানায় যোগদানের পর সে ছুটিও পাইনি, বাড়ীতেও আসে নাই।
স্থানীয় কামরুল ইসলাম বলেন, রাকিবুল ইসলাম আমার ভাতিজা সম্পর্ক। তাকো কখনো কোনো খারাপ কাজে দেখি নাই। গ্রামের কোনো ঝামলোয় সে জড়ায়নি। সে নিখোঁজ হয়ে গেছে এ খবর শুনার পর আমরা অবাক হয়ে গেছি। আমরা কখনোই এরকম খবর শুনব এটা আশাবাদী ছিলাম না। রাকিব নিখোঁজ এটা খুবই দু:খজনক। আমরা প্রশাসনের কাছে অবাদার জানাই আমাদের ভাতিজাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে আমাদের মাঝে ফিরেয়ে দেয়। আমাদের রাকবকে আমরা সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই।
পাশের বাড়ীর কামরুল ইসলাম বলেন, শুভর বাবার কাছে শুনেছি সে নিখোঁজ হয়ে গেছে। সহজ-সরল ছেলেটা কিভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলো। তার জন্য গ্রামের সকল নারী-পুরুষ শোকাহত। তাদের সবার একটাই দাবি দ্রুত তাদের ছেলেকে প্রশাসন উদ্ধার করুক।
নিখোঁজ এসআই রাকিবুল হাসান সরকারের বাবা মাইজুদ্দিন সরকার বলেন, তার ছেলে কলা বাগান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হাসান সরকার নিখোঁজের ঘটনায় শ্রীপুর থানা থেকে বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল পৌণে ১১ টা পর্যন্ত কোনো ধরনের খোঁজখবর কেউ নেয়নি এবং তিনি বা তার পরিবারের কেউ শ্রীপুর থানায় এ বিষয়ে যোগাযোগ করেনি।