
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের শ্রীপুরে গৃহবধূ গর্ভজাত তিশাকে (২২) নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও শুশুর -শাশুড়ীর বিরুদ্ধে। তারা তিশাকে হত্যার পর প্রকৃত ঘটনায় আড়াল করতে ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালায়। ঘটনার পর স্বামী ও শুশুর-শাশুড়ী পলাতক রয়েছে। নিহতের পরিবারের দাবি এটি পরিকল্পিত হত্যা।
গৃহবধূ মৃত্যুর ঘটনায় তিশার পরিবার হত্যা মামলা দিতে চাইলেও শ্রীপুর থানা পুলিশ অপমৃত্যু মামালা নিয়েছে অভিযোগ করেন তিশার মা আছমা খাতুন। পুলিশের কথামতো মামলা না দিলে তার মেয়ের ময়নাতদন্ত হবে না বলেও তাদেরকে জানানো হয়। নিহত তিশার মায়ের অভিযোগ প্রকৃত আসামীদের আড়াল করার চেষ্টা করছে পুলিশ। এ জন্য রাতভর তাদেরকে থানায় বসিয়ে রেখে পুলিশ নিজে এজাহার লিখে অপমৃত্যু মামলা নিতে তাকে বাধ্য করে।
নিহত গৃহবধূ তিশা উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের পেলাইদ গ্রামের হাবিবুল্লাহর ছেলে। চার বছর পূর্বে শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব এলাকার মজিবর রহমানের ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর (২৭) সাথে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে দেন তাকে। তাদের সাংসার জীবনে আব্দুল্লাহ (২) এক ছেলে রয়েছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৮টার দিকে গৃহবধূর স্বামীর বসত ঘরের বৈদ্যুতিক সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ফাঁসিতে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে সরেজমিন গোসিংগা ইউনিয়নের পেলাইদ গ্রামে তিশার বাবার বাড়ী গিয়ে দেখা যায় বাড়ীতে স্বজন ও গ্রামবাসীর ভীড়। মা আছমা খাতুন মেয়ের মৃত্যুর ৮দিন পরও বিলাপ করছেন। কোনো ভাবেই স্বামী ও শুশুর-শাশুড়ীর নির্যাতনে মেয়েকে হত্যার কথা ভুলতে পারছেন না। বিলাপ করে তিনি বলতে থাকেন আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই, ফাঁসির বদলে ফাঁসি চাই। ঘরে যা ফার্নিচার লাগে সবকিছু দিয়েছি। স্বামীকে মোটরসাইকেল দিয়েছি। শ্বশুরবাড়ী থেকে দাবি আরো যৌতুক দিতে হবে। মেয়েকে বলে এটা আনতে, ওইটা আনতে।
ঘটনার দিন মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে মেয়ে আমাকে ফোন করে বলে মা তাড়াতাড়ি আসো, তারা আমাকে মাইরা ফেলতেছে। তুমি তাড়াতাড়ি না আসলে আমার লাশ পাইবা। মেয়ের ফোন পেয়ে বোরকা পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উজিলাব মেয়ের শুশুড় বাড়িতে যাই। যাইয়া দেখি অনেক লোকজন। মেয়ের স্বামী ও শুশুর-শাশুড়ী কেউ বাড়িতে নেই। যখন মেয়ে আমাকে ফোন করে বলেছে মা আমারে মাইরা লাইতেছে, এরপরই তারা আমার মেয়েকে মেরে ঝুলিয়ে রাখে। আমি যাইয়া দেখি আমার মেয়েকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখছে।
অপমৃত্যুর এজাহারের শেষাংসে লেখা রয়েছে আমি (তিশার মা) আমার মেয়ের মৃত্যুর বিষয়ে আমিসহ পরিবারের লোকজন ও আত্নীয়-স্বজনদের কারোও সন্দেহ নাই। এ বিষয়ে তিশার মা বলেন, মামলার এজাহার লেখা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। পুলিশ তাদের মতো করে এজাহার লিখে নিয়ে এসে আমাকে স্বাক্ষর দিতে বলে। পুলিশের কথামতো মামলার কাগজে স্বাক্ষর না দিলে মেয়ের ময়নাতদন্ত হবে না বলেও তাকে জানানো হয়। আমি মামলা দিতে চাইলে পুলিশ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আসার আগে মামলা নিতে পারবে না বলে জানায়। তিনি দাবি করেন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে পুলিশ শুরু থেকেই অপমৃত্যু হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। আমি এর বিচার চাই।
তিশার মাদ্রাসার শিক্ষক ও জ্যাঠা রুহুল আমীন বলেন, তিশা আমার ভাতিজি ও আমার মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। সে মেধাবী ছাত্রী এবং খুব ভালো মেয়ে ছিল। তার মৃত্যু সংবাদ শুনে ঘটনাস্থলে যাই। থানায় লাশ নিয়ে আসে। থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীরকে জানাই এটা আত্মহত্যা না, তাকে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। উনি আমাদের কথা কর্নপাত না করে নিজের মতো লিখে মেয়ের মায়ের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে গেছে।
নিহত তিশার মা ও পরিবারের সদস্যদের আপত্তি থাকার পরও অপমৃত্যুর এজাহারে ‘পরিবারের লোকজন ও আত্নীয়-স্বজনদের কারও কোন সন্দেহ নাই’ কেন লিখছেন এ প্রশ্নে শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, ওসি স্যারের নির্দেশে এটা লিখা হয়েছে। আপনি (সাংবাদিক) কোথায় আছেন, দেখা করেন। তখন তিনি বলেন তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। আপনি এ বিষয়ে ওসি স্যারের সাথে কথা বলেন।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমদের সরকারি নাম্বারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।