
বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি : পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জনসাধারণের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিতে, বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের পাশাপাশি আবাসিক অসুবিধা লাঘবের জন্য,সরকারি অর্থায়নে, বান্দরবান জেলা সদরের বালাঘাটা এলাকায় বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন উপজাতীয় আবাসিক ছাত্রাবাস গড়ে তোলা হয় ১৯৮৪ সালে।
এই ছাত্রাবাসের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই জেলা সদর ও উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের সন্তান,যাদের অভিভাবকদের অনেকেই চাষাবাদ ও নিম্ন আয়ের।
এসব প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠী তাদের সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকারি সুবিধায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগের পাশাপাশি আবাসিক হোস্টেলে তাদের সন্তানদের ভর্তি করে।
সরজমিনে দেখা যায় বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন উপজাতিয় আবাসিক হোস্টেল এ বর্তমানে ৭৪ জন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থী হোস্টেলে অবস্থান করছে,যেখানে থাকা,খাওয়া সহ সকল সুযোগ সুবিধা সরকারি খরছে বহন করা হয়।বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিকটস্থ বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ থেকে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বর্তমানে আবাসিক ছাত্রাবাসে ৩৪ জন ছেলে এবং ৪১ জন মেয়ে শিক্ষার্থী অবস্থান করছে যাদের বয়স – ৯ বছর থেকে ১২ বছর।তাদের থাকার জন্য ছাত্রাবাসে আছে একটি খাট,একটি তোষক,একটি বালিস, বিছনার চাদর,তবে দেখে বুঝার উপায় নেই এটি আদৌ কার্যকর আছে কিনা।
নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আবাসিক ছাত্রাবাসের ভেতরে,জরাজীর্ণ অবস্থায় ছাত্রাবাসের টিনের চাল থেকে শুরু করে ইটের দেয়াল,ছাত্রাবাসের চারপাশ যেনো বহুকালের এক অবহেলার সাক্ষী।
শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সেনিটেশন ব্যাবস্থার অভাব,বাথরুম গুলোর দরজা নেই,ছেলে ও মেয়েদের আলাদা বাথরুম নেই ৭৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য আছে ৬ টি টয়লেট। শিক্ষার্থীদের দৈনিক খাবারের ব্যাবস্থা থাকলেও,ডাইনিং এর ব্যাবস্থা নেই।
শোয়ার জন্য খাট থাকলেও,পড়ার জন্য টেবিল ও চেয়ারের অভাব।রুমের দরজা ও জানালা গুলোর অবস্থাও জীর্ণশীর্ণ।ক্লাস চলা অবস্থায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে রান্নাবান্নার কাজ করতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষার্থী এবং ছাত্রাবাসের দায়িত্বশীল বাবুর্চি জানান,৭৪ জন শিক্ষার্থীর রান্নাবান্নার কাজ করছেন,বয়স ৬৫ উর্ধ একজন মহিলার একার পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব না হওয়ায় ৫-৬ জন শিক্ষার্থী তাকে রান্নার কাজে সাহায্য করছে।মাসে ১২ হাজার টাকা বেতন পান।
এদিকে শ্রেণীর পাঠদান চলা সর্তেও, ক্লাসে না গিয়ে রান্নাবান্নার কাজে, শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনিহা সর্থেও কাজ করে যেতে হচ্ছে।যা কখনই কাম্য নয়।
শিক্ষার্থীদের একজন অভিভাবক তার সন্তানের সাথে দেখা করতে আসলে,প্রতিবেদকের প্রশ্নে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,এখন অভিযোগ দিলে আমার সন্তানের ক্ষতি হবে,আমরা অনেক দুর থেকে এসে আমাদের সন্তানদের পড়ালেখার কথা চিন্তা করে এই আবাসিক ছাত্রাবাসে রেখে গেছি,টাকা থাকলে তো বড় হোস্টেলে রেখে পড়াতাম।
খোঁজ নিয়ে আবাসিক ছাত্রাবাসের তত্বাবধায়কের রুম তালাবদ্ধ পাওয়া গেলে একজন মহিলা প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে এগিয়ে আশে,বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান তার স্বামী এই আবাসিক ছাত্রাবাসের দায়িত্বে আছেন,তিনি এখন স্কুলে।
খোঁজ নিতে সরজমিনে বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিবেদকের সাথে দেখা হয় ছাত্রাবাসের কেয়ারটেকার মং কৈ চিং এর সাথে।
আবাসিক ছাত্রাবাসটির কেয়ার টেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মং কৈ চিং।
বিদ্যালয়ে তার নিয়মিত শিক্ষকতার পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন উপজাতীয় আবাসিক ছাত্রাবাসের দায়িত্ব পালন করছেন বলে প্রতিবেদককে জানান।
ছাত্রাবাসের অতিরিক্ত দায়িত্বের জন্য তিনি জেলা পরিষদ হতে মাসে একশত টাকা সম্মানি গ্রহণের কথা জানান।
মাসে ১০০/- সম্মানী গ্রহণ করে আবাসিক ছাত্রাবাসের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি রীতিমতো অবাক করার মতো।
আবাসিক ছাত্রাবাসের এই বেহাল অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান,দুই-তিন বছর আগে হতেই এখানে ঝাড়ুদার, আয়া নেই,১০-১২ বছর হলো এখানে নাইটগার্ডও নেই।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি অকপটে দায় স্বীকার করে বলেন,এ বিষয়ে জেলা পরিষদে অনেকবার ধরনা দিয়েও কোন লাভ হয়নি।যারা ছিলো তারা মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলো,চাকরি স্থায়ী না করায় উনারাও চলে গিয়েছে।
কেনো আলাদা ভাবে আবাসিক হোস্টেল টিতে কেয়ার টেকার দেয়া হয়নি এ প্রশ্নের জবাবে তিনি এড়িয়ে যান।১০০ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে কেনো দায়িত্ব পালন করছেন?এতে আপনার কোন সার্থ আছে কিনা,এমন প্রশ্নে তিনি জরুরি কাজের কথা বলে প্রতিবেদকের প্রশ্ন এড়িয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যান।
তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী আবাসিক ছাত্রাবাসে থাকা ছাত্রছাত্রীদের জন্য দিনে তিন বেলা খাবার বাবদ মাথাপিছু ৮৪ টাকা বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ হতে বরাদ্দ দেয়া আছে।
সে হিসেবে ৭৪ জন শিক্ষার্থীর মাথাপিছু খরচের সর্বসাকুল্যে প্রতিদিন ৬ হাজার দুইশত ষোল টাকা ছাত্রাবাসের কেয়ারটেকার বা নিয়োজিত দায়িত্বশীল পেয়ে থাকেন। তবে আবাসিক ছাত্রাবাসের কেন্টিন ও খাবারের মান বিবেচনায় টাকার পরিমাণে মান যথার্থ বলে মনে হয়নি প্রতিবেদকের কাছে।
এদিকে প্রতিদিন মাথাপিছু খাবারের টাকা হোস্টেল কর্তৃপক্ষের হাতে আসলেও, সরজমিনে ৭৪ জন শিক্ষার্থী হোস্টেলেই অবস্থান করছে এমনটা মিল পাওয়া যায় নি।সে হিসেবে দৈনিক কোন হিসাবে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের ৮৪ টাকা খাবার খরচ দেখানো হয় সেটা স্কুলের সহকারী শিক্ষক ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী ছাত্রাবাসের কেয়ারটেকার মং কৈ চিং প্রতিবেদকের কাছে পরিস্কার ভাবে উপস্থাপন করেন নি।
এদিকে সরজমিনে দুই তলা বিশিষ্ট আবাসিক ছাত্রাবাসের উর্ধ সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে দেখা যায়,খোঁজ নিয়ে জানাযায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যায়ে আবাসিক ছাত্রাবাসের তৃতীয় তলা সম্প্রসারণের কাজ চলমান আছে।চলমান কাজটি ঠিকাদার মোস্তাক করছেন বলে ছাত্রাবাসের কেয়ারটেকার মং কৈ চিং প্রতিবেদকের কাছে নিশ্চিত করেন।
তবে নির্মাণ কাজে ব্যাবহৃত কাঁচামালের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দেখা যায়,নিম্নমানের ইটের খোয়া আর নদীর বালি দিয়ে ঠিকাদার মোস্তাক দায়সারাভাবে কাজটি দ্রুত শেষ করতে চাইছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ ফারুক জানান,এ ধরনের নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আবার সংস্কার করতে হবে,এটা সরকারের আর্থিক ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই না।তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো বেশি তদারকির দাবী করেন।
এ বিষয়ে ঠিকাদার মোস্তাক এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে, পরে কথা বলবেন বলে প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও সংযোগ না পাওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
আবাসিক ছাত্রাবাসের নানা অনিয়ম ও নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে,বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা’র কাছে জানতে চাইলে তিনি ছাত্রাবাসের বর্তমান অবস্থা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,এ ভাবে শিক্ষার্থীদের বেড়ে উঠা আসলেই দুঃখজনক।
তিনি বলেন এটা একদিনে এমন হয়নি,ইতিপূর্বের চরম অবহেলার কারণে আজকে আবাসিক ছাত্রাবাসের এই অবস্থা,বর্তমানে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৪০ লাখ টাকা ব্যায়ে আবাসিক ছাত্রাবাসের সম্প্রসারণ ও মেরামতের কাজ চলছে,কাজে কোন অনিয়ম হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহণের কথা জানান জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরো জানান শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি, তাদের জীবনমানের কথা চিন্তা করে আগামীতে বালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন উপজাতিয় আবাসিক হোস্টেলটির সম্পূর্ণ যুগোপযোগী সংস্কার এর জন্য প্রস্তাবনা রাখবো,আমরা চাই পাহাড়ের অযপাড়ায় বসবাসকারী জনসাধারণ তাদের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য স্কুলে পাঠাক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠী শিক্ষিত হলেই আমাদের কে আর কেউ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বলতে পারবে না।
শিক্ষার্জনের পাশাপাশি আবাসিক ছাত্রাবাসে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ,নিরাপদ আবাসন, ডাইনিং সুবিধা,প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা,স্বাস্থকর সেনিটেশন ব্যাবস্থা,শিক্ষামূলক বিনোদনের সুবিধা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ,ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবক বৃন্দ। দ্রুত সময়ের মধ্যে আবাসিক ছাত্রাবাসের সকল অসুবিধা সমাধানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদী অভিভাবক বৃন্দ।