কক্সবাজার প্রতিনিধি: ২১ অক্টোবর ২০২৫ , ৬:২৬:১০ প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়ায় কোস্টগার্ডের সাম্প্রতিক বিতর্কিত অভিযান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। গত ১৮ অক্টোবরের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী, মৎস্য ব্যবসায়ী নাজেম উদ্দিন মাতাব্বরসহ অন্যান্যদের ‘নিরীহ’ দাবি করে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং হয়রানি বন্ধের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কক্সবাজার উপকূলীয় সাংবাদিক ফোরামের কার্যালয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শহীদ তানভীর ছিদ্দিকীর পরিবার এবং বিএনপি সমর্থিত কয়েকটি পরিবার উপস্থিত ছিল। ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, কোস্টগার্ডের এই অভিযান ছিল পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যমূলক এবং এটি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতির মধ্যে রাখার একটি প্রচেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে নিহত তানভীরের স্বজন মোহাম্মদ আলীর কলেজ পড়ুয়া কন্যা নিঝুম মনি সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, স্থানীয় এক পলাতক আওয়ামী লীগ ‘গডফাদার’ তারেক শরীফের ইন্ধনে ও কোটি টাকার অর্থায়নে কোস্টগার্ড বারবার তাদের বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে।
নিঝুম মনি দাবি করেন: “নিরীহ মানুষকে ধরে এনে বস্তা বস্তা অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জন্য এমন ঘটনা দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রমাণ হবে, এসব অভিযান প্রকৃত অপরাধী ধরার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করার উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে।”
ভুক্তভোগী পরিবারের আরেক সদস্য জেসমিন আক্তার প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চেয়ে বলেন, “আমাদের নিরপরাধ পরিবারের উপর কোস্টগার্ডের এই জুলুম বন্ধ হোক। আমরা বিচার চাই।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ১৮ অক্টোবরের অভিযানে অনেক সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রকৃত দাগি সন্ত্রাসীরা ছিল অদৃশ্য।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, এই অভিযান মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে। তার কজন আত্মীয় কোস্টগার্ডে কর্মরত থাকায় তিনি প্রভাব খাটাচ্ছেন এবং এই অভিযানকে ‘অস্ত্র উদ্ধারের নামে লোকালয়ে নাটক মঞ্চস্থ’ হিসেবে দেখছে স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আরও জানায়, ১৮ অক্টোবরের অভিযানে প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে নিরীহ মৎস্যজীবী, কৃষক ও ছাত্রদের আটক করা হয়। পরদিন ১৯ অক্টোবর মহেশখালী থানায় দায়ের করা মামলায় শহীদ তানভীরের ভাই মোহাম্মদ আলী, চাচা নাজেম উদ্দিন মাতব্বর, যুবদল কর্মী সবুজ, কৃষক আতিকুর রহমান ও মানিকসহ ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। স্থানীয়রা নিশ্চিত করেন, তারা সাধারণ পেশাজীবী মানুষ, যাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করা হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষক আবু তাহের বলেন, “অভিযান দরকার ছিল পাহাড়ি অঞ্চলে, যেখানে আসল সন্ত্রাসীরা অবস্থান নেয়, কিন্তু অভিযান হয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি সংলগ্ন লোকালয়ে। এ ধরনের পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ প্রশাসনের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।”
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এর আগে ২০ মার্চ মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তারেক চেয়ারম্যানের বাহিনীর সদস্য ওয়াসিম ও আনসারুল্লাহ নামে দুই যুবক সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলো কোস্টগার্ড। আবু পরিবারের প্রতিপক্ষ ছিলো সন্ত্রাসী ওয়াসিম ও আনলসারুল্লাহ। তাদের নিয়ে একটি অভিযানে কোস্টগার্ড একই কায়দায় কালারমারছড়ার ঝাপুয়া এলাকায় তিন নিরীহ ভাইকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, পরে যারা নির্দোষ প্রমাণিত হন।
এছাড়া, ৮ এপ্রিল কোস্টগার্ডের অভিযানে গুলিতে এক মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপির কর্মী আবু নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায়ও বিচার না হওয়ায় জনগণের মনে ক্ষোভ বাড়ছে।
পরিবারের সদস্যরা অবিলম্বে বিতর্কিত অভিযান বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শহীদ তানভীর ছিদ্দিকীর ভাইপো মোহাম্মদ শিপন, কলেজ পড়ুয়া ছাত্র মোহাম্মদ সোহাগ, আসিফ, ছাত্রদলের নেতা তানিশ প্রমুখ।
কোস্টগার্ডের কর্মকর্তা আমিনুল হক এই অভিযান প্রসঙ্গে জানান, “কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক করা হয়ে থাকলে বিষয়টি অবশ্যই যাচাই-বাছাই করা হবে।” তবে, অভিযান চলাকালে সাংবাদিকদের লাইভে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযানের দাবি উঠলেও তিনি নিশ্চিত করেন যে, গত ১৮ অক্টোবরের অভিযানে কোস্টগার্ড মূলত সমতল ভূমিতেই তল্লাশি চালিয়েছে এবং সেখান থেকেই অস্ত্রসহ নয়জনকে আটক করা হয়েছে।

















