
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের অন্যতম প্রধান সমস্যা—হোটেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে হোটেল ‘দি সী-প্রিন্সেস’। এই হোটেলের ময়লা পানি দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি সৈকতে ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণ এবং সৈকতের স্বাস্থ্যহানির অন্যতম কারণ। এই অনিয়ম ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিবেশবিদদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হোটেল দি সী-প্রিন্সেস এর মুখোমুখি পশ্চিম পাশে সড়কের নিচ দিয়ে টানা পাইপ ব্যবহার করে হোটেলের সমস্ত ময়লা পানি সৈকতের বালিয়াড়িতে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পানি পড়ার কারণে সেখানে কচু গাছসহ নানা গাছগাছালি জন্মে একটি ‘কচুর বাগান’-এর মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ময়লা পানি যেন সৈকতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য বালিয়াড়িতে ছোটখাটো একটি পুকুরের সমান আকারের ডোবা তৈরি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক দোকানদার জানান, গভীর রাতে হোটেল কর্তৃপক্ষ ময়লা পানি ছেড়ে দেয়। সন্ধ্যার পরেও বালিয়াড়িতে পানি পড়লে চারিদিকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যার কারণে পর্যটকদের নাকে কাপড় দিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। এই বর্জ্য মিশ্রিত জমা পানিতে মশা-মাছি ও নানা পোকার উৎপাত বেড়েছে। ডোবায় মরা ইঁদুর, সাপ, বিড়ালের মতো বর্জ্য ফেলার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ড্রেন নেই, তাই সৈকতে বর্জ্য: হোটেল কর্তৃপক্ষের স্বীকারোক্তি:
এই গুরুতর অভিযোগ অকপটে স্বীকার করেছেন হোটেল দি প্রিন্সেসের পরিচালক কুতুব উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, হোটেল সরকারকে নিয়মিত ভ্যাট, ট্যাক্স ও রাজস্ব দিলেও কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো ড্রেন তৈরি করে দেয়নি। তিনি বলেন, “এতবড় হোটেলের ময়লাগুলো কোথায় যাবে আপনি বলেন? ড্রেন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই বলেই আমি সৈকতে ময়লা পানি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছি।”
তবে পরিচালক স্বীকার করলেও, তথ্য বলছে, কক্সবাজারের বেশিরভাগ হোটেলেই পরিবেশ দূষণ রোধের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) বা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) নেই। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এবং অংশীজনদের সভায় এসটিপি স্থাপনের উপর জোর দেওয়া হলেও ফলদায়ক কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বারবার জরিমানা, তবুও অপরাধ অব্যাহত:
হোটেল দি প্রিন্সেসের বিরুদ্ধে মালিকানা, নকশা ও অপরিচ্ছন্ন খাবার পরিবেশনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ৭ মার্চ পচা-বাসি খাবার ও তেলাপোকায় ভরপুর রান্নাঘরের অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হোটেলটিকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছিলেন।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: আজিম খান (পর্যটন সেল) জানান, দুই মাস আগেও একই অপরাধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দি প্রিন্সেস হোটেল কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল এবং তারা অঙ্গীকার করেছিলেন যে এই অপরাধ আর করবেন না। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এখন যদি তারা আবার একই কাজ করেন তখন আমাদেরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া লাগবে।”
পরিবেশ নের্তৃবৃন্দরা অভিযোগ করে বলেন, পরিকল্পিত পর্যটন শহর না হওয়ায় নানা অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় হোটেল-মোটেলগুলো দায়ছাড়া ব্যবসা করছে। সমুদ্রের পরিবেশ দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের আন্তরিকতা ও সমন্বয় থাকা দরকার, অন্যথায় একে অপরের উপর দায় চাপিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।