
কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে চরাঞ্চলের শত শত বিঘা জমির বাদাম পানিতে ডুবে গেছে। ফলে এ অঞ্চলের কৃষকেরা পাকা, আধা পাকা বাদাম তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বাদাম চাষীদের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। বাদামের ক্ষেতে হাঁটু পর্যন্ত পানি হওয়ায় বিপাকে পরেছেন চাষিরা। তবে তারা দাবি করেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আমাদের চরাঞ্চল বাসীকে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবারে উপজেলায় বাদাম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৩ শত ৬০ হেক্টর। যা অর্জিত হয়েছে ৩ শত ৬৫ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৫ হেক্টর বেশি অর্জিত হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শত ৩৮ মেট্রিকটন। তারা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর ২ শত ৫ হেক্টর বাদাম চাষ বেশি হয়েছে। এবারে বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছিল। বাজারেও ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষক। কিন্তু চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় কিছু কিছু বাদামের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চাষীরা হতাশ বলে জানান।
শনিবার (১৭ মে) তিস্তা বেষ্টিত গোড়াই পিয়ারেরচর সহ অন্যান্য নিচু এলাকার চর গুলোতে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার পানিতে জমি তলিয়ে যাওয়ায় পানির নিচ থেকে বাদাম তুলে উঁচু জায়গায় রাখা হচ্ছে। সেখানে কৃষক পরিবারের নারী, শিশুসহ সব সদস্য মিলে বাদাম ছাড়াচ্ছেন। বাদামের ক্ষেতে হাটু পর্যন্ত পানি হওয়ায় পানিতে ডুবিয়ে বাদাম উঠাতে দেখা যায়। শ্রমিক না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। তারা জানান, এখনো বাদাম পরিপক্ক হয়নি এদিকে তিস্তা নদীর পানির গ্রাসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বাদাম। নিরুপায় হয়ে অপরিপক্ক বাদাম উঠাতে হচ্ছে ক্ষেত থেকে। চরাঞ্চল গুলোর মধ্যে নিচু এলাকা গুলোর বাদামের ক্ষেত গুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। তারা জানান, বাদাম চাষাবাদে যা খরচ হয়েছে তার সিকি অংশ না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ঋন করে বাদাম চাষাবাদ করে বাদাম চাষীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেছে।
এ ব্যাপারে গোরাইপিয়ারের চরের বাদাম চাষী আবুল মিয়া জানান, তিস্তার চরে বালু মাটির উপরে পলি কাদামাটিতে বাদামের চাষ ভালো হওয়ায় প্রতি বছর কৃষকরা বাদাম চাষ করেন একরময় একর জমিতে। তিনি প্রায় ৫ একর জমিতে বাদামের আবাদ করেছে। ফলনও ভালো হয়েছিল। তবে তিস্তায় বৃষ্টি ও উজানি ঢলে পানি বৃদ্ধির কারণে ৫ একর জমির বাদাম নষ্ট হয়েছে। এতে ৪ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হবে। এছাড়া অপরিপক্ক বাদাম পানি থেকে উঠানো হচ্ছে তার তিন ভাগেরও একভাগ পাওয়া যাবেনা বলে জানান তিনি।
অপর আর এক চাষি সাহেব আলী জানান, এবারে ৪ একর জমিতে বাদামের চাষ করেছেন। জমিতে পানি উঠার উপক্রম হওয়ায় অপরিপক্ক বাদাম উঠানো শুরু করেছি। এখন যা পাবো পানিতে তলিয়ে গেলে তাও পাওয়া যাবেনা। এখন পর্যন্ত তিনি ৩ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। এ অপরিপক্ক বাদামে ৫০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে কিনা বলে জানান তিনি।
এছাড়াও চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বাদাম চাষি মাহাতাব, আব্দুর রহিম, নুরুল হক, এরশাদুল মিয়া, সুরুজ মিয়া, শেখ ফরিদ, নুরু মিয়া, সাইদুল ইসলাম , বক্কর মিয়া ও ধলু মিয়া সহ আরও অনেকে বলেন, বাদামের বাম্পার ফলন হলেও তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে চরের নিচু এলাকার বাদামের ক্ষেত তলিয়ে যায়। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। তারা এ ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে নিবেন ভেবেই পাচ্ছেন না। পরিবার পরিজন নিয়ে কিভাবে চলবেন তার কোন পথ নেই বলে জানান তারা।
বাদাম উঠাতে আসা শ্রমিক রানা মিয়া, আনিছুর রহমান, নুরন্নবি মিয়া, মেহেদি, বিপুল মিয়া ও নোমান সহ আরও অনেকে বলেন, পানিতে থেকে বাদাম উঠাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। বাদাম ক্ষেতে পানি উঠায় কেউ কাজে আসতে চাননা। তার পরেও পেটের দায়ে চাষিদের উপকারে কাজ করতে এসেছি। পানির নিচের অপরিপক্ক বাদাম তুলে চাষিরা লাভবান হতে পারবেননা। তারা ক্ষতির মখে পরবেন বলে জানান তারা।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান জানান, তিস্তার চরের নিচু এলাকার কিছু কিছু চর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অর্ধশতাধিক বিঘা জমির বাদাম নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার ও কৃষিবিদ মোশারফ হোসেন জানান, তিস্তার চরাঞ্চলে এ বছর বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। তিস্তা নদীতে পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার কিছু বাদামের জমি তলিয়ে গেছে। এতে কৃষক কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হবে। সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা আসলে তাদের দেয়া হবে।